শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

হামাদ বিমানবন্দরে যুগ পার সাখাওয়াতের, মনে পড়ে আছে কাপাসিয়ায়

বোরহান উদ্দিন, কাতারের দোহা থেকে
প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৭ এএম

শেয়ার করুন:

হামাদ বিমানবন্দরে যুগ পার সাখাওয়াতের, মনে পড়ে আছে কাপাসিয়ায়
সাখাওয়াত হোসেন

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে নিখুঁত কোনো শহর। মাথার ওপর সুউচ্চ ছাদ, চারপাশ একদম পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে। কাতারের রাজধানী দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সি-টু টার্মিনালের একটি নামাজঘরের বাইরে তখন নিজের দায়িত্ব পালন করছিলেন সাখাওয়াত হোসেন। দূর থেকে বোঝার উপায় নেই, এই চেহারার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ প্রবাসজীবনের ক্লান্তি। দেখতে বেশ সুন্দর, শারীরিক গঠনও বেশ ভালো। নির্ধারিত পোশাকে দায়িত্বে থাকা এই যুবক ঢুকতেই হাসিমুখে সালাম দিলেন। সালামের জবাব শুনে হঠাৎ মনে হলো ছেলেটি বাংলাদেশের কিনা জেনে দেখি। বাড়ি কোথায় জানতে চাইতেই মৃদু হেসে বললেন, ‘ভাই, বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়।’

এভাবেই শুরু হলো তার কাতারে প্রবাসজীবনের না বলা গল্প। মরুভূমির এই দেশটিতে সাখাওয়াত পার করে দিয়েছেন এক যুগ বা তারও বেশি সময়। ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী ফ্লাইটের জন্য বিমানবন্দরটি যখন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়, সেই শুরুর দিকের সাক্ষী এই তরুণ। 

হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

পুরনো দোহা বিমানবন্দরের চাপ কমাতে পারস্য উপসাগরের তীরে গড়ে ওঠা এই বিমানবন্দর আজ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাব। কাতার এয়ারওয়েজের মূল ঘাঁটি এই বিমানবন্দরটিতে রয়েছে বিশ্বখ্যাত ইনডোর ট্রপিক্যাল গার্ডেন ‘দ্য অর্চার্ড’-এর মতো নান্দনিক সব আয়োজন। এই বিশাল বিমানবন্দরের ক্লিনিং, মেইনটেন্যান্স বা লজিস্টিকসের কাজে জড়িত কর্মীদের বড় একটা অংশই বাঙালি।

তবে বিমানবন্দরের এই চাকচিক্য আর আধুনিকতা সাখাওয়াতের মনে খুব একটা স্বস্তি আনতে পারে না। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে জমে থাকা আক্ষেপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

১২ বছর আগের স্মৃতি তুলে ধরে ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে শুধু এই বিমানবন্দরটিতেই আমাদের দেশের ৩০০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করত। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, সেই সুযোগগুলো কমে আসছে। এখন অন্য দেশের লোকজন এখানে বেশি কাজ পাচ্ছে।’

হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

বিমানবন্দরের ভেতরের পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে সাখাওয়াত জানান, নারী ও পুরুষদের আলাদা গোছানো নামাজঘর, সেন্সরযুক্ত পানির ট্যাব— সবকিছুই একদম নিখুঁত। যদিও এই সৌন্দর্যের বাইরে নিজের প্রবাস জীবনটা তার কাছে বড়ই কষ্টের। পড়াশোনা বেশি দূর না এগোয়ায় প্রবাসের পাট চুকিয়ে দেশে ফিরে কী করবেন, সেই অনিশ্চয়তা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায় বলে জানালেন প্রতিবেদককে।

সাখাওয়াত হোসেন এবং ঢাকা মেইলের প্রধান প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিন
সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে  প্রতিবেদক

দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আরও বলেন, ‘এখন আর এখানে মন টেকে না। সুযোগ-সুবিধা আগের চেয়ে কমেছে, তাই মন পড়ে থাকে দেশের বাড়িতে। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু প্রবাসীদের নিয়ে কেউ ভাবে না। আমাদের দেশেও তো এমন সুন্দর বিমানবন্দর হতে পারে। আমরা যারা প্রবাসে ঘাম ঝরাচ্ছি, দেশে কাজের সুযোগ পেলে এই মেধা ও শ্রম দেশ গড়ার কাজেই লাগাতে পারতাম।’

কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতিতে হামাদ বিমানবন্দরের ভূমিকা যেমন বিশাল, তেমনি এর নেপথ্য কারিগর হিসেবে সাখাওয়াতের মতো লাখো প্রবাসীর অবদানও অনেক। 

জানা গেছে, কাতারে তিন লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি থাকলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই সাখাওয়াতের মতো তরুণেরা প্রবাসে বসেও খুঁজে ফেরেন নিজেদের শেকড়।

বিইউ/এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর