বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ফ্যাটি লিভার: সচেতন না হলে রয়েছে ক্যানসার ও মৃত্যুঝুঁকি

মাহফুজ উল্লাহ হিমু
প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০২৩, ০৭:০৮ এএম

শেয়ার করুন:

ফ্যাটি লিভার: সচেতন না হলে রয়েছে ক্যানসার ও মৃত্যুঝুঁকি

সারাবিশ্বে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ লিভার ক্যানসার। বিশ্বে মোট মৃত্যুর ষষ্ঠ প্রধান কারণ লিভার ক্যানসার এবং ক্যানসারে মৃত্যুর চতুর্থ কারণ ক্যানসারের বিশেষ এ ধরন। সাধারণত হেপাটাইটিস বি, সি এবং অ্যালকোহল গ্রহণকে লিভার ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো হেপাটাইটিস (ন্যাশ) বা ফ্যাটি লিভার এর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত বাংলাদেশে লিভার ক্যানসারের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার।

একজন ফ্যাটি লিভার রোগীর প্রাথমিক স্টেজে থাকা অবস্থায় চিকিৎসা নিতে খরচ হয় ১৬ হাজার ৮২০ টাকা। আর তা লিভার সিরোসিসে পরিণত হলে মাত্র তিন মাসেই খরচ হয় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ধারণা অনুযায়ী এত সংখ্যক রোগীর চিকিৎসার প্রাথমিক স্তরেই খরচ হবে প্রায় ৭৫ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা, যা দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের দ্বিগুণ।

বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির তথ্যমতে, দেশে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত, যার শেষ পরিণতি লিভার ক্যানসার। সঠিক সময়ে ভালো চিকিৎসা না পেলে এ বিরাট সংখ্যক রোগী লিভার সিরোসিস, টিউমার এবং সর্বশেষ লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা দেশে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির পাশাপাশি আর্থিক ঝুঁকিরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একজন ফ্যাটি লিভার রোগীর প্রাথমিক স্টেজে থাকা অবস্থায় চিকিৎসা নিতে খরচ হয় ১৬ হাজার ৮২০ টাকা। আর তা লিভার সিরোসিসে পরিণত হলে মাত্র তিন মাসেই খরচ হয় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ধারণা অনুযায়ী এত সংখ্যক রোগীর চিকিৎসার প্রাথমিক স্তরেই খরচ হবে প্রায় ৭৫ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা, যা দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের দ্বিগুণ। এদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় এ খরচ উল্লেখিত আর্থিক হিসেবের দ্বিগুণেরও বেশি।

লিভার বিশেষজ্ঞরা জানান, ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্তির এখনও কোনো সরাসরি কার্যকর ওষুধ নেই। যদিও সঠিক সময়ে চিকিৎসায় আক্রান্তরা আরোগ্য লাভ করতে পারেন এবং লিভার সিরোসিস ও ক্যানসার হওয়া প্রতিরোধ করতে পারেন। এ রোগটি যতটা ঝুঁকিপূর্ণ, ততোটাই প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু বাংলাদেশে এর সচেতনতার ঘটতি রয়েছে। এমনকি উন্নত বহু দেশেও এই রোগ সম্পর্কে জানেন না বেশিরভাগ মানুষ। এ অবস্থায় ফ্যাটি লিভার ও পরবর্তী জটিল পরিস্থিতি রোধে সচেতনতার বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের


বিজ্ঞাপন


জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের লিভার রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফারুক আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কিত একটি অসুখ হলো ন্যাশ বা ফ্যাটি লিভার। দেশে এখন পর্যন্ত পরিচালিত জরিপ মতে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষের দেহে ফ্যাটি লিভার রয়েছে। অর্থাৎ ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি মানুষই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। বিশেষ করে গ্রামের মা বোনেরা। যারা একটু স্থূলকায় তাদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে ন্যাশ। সাধারণত ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তে কোলেস্টেরলের আধিক্য থাকলে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি যারা পর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রম করেন না, তাদের মধ্যেও ফ্যাটি লিভারের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

তিনি আরও বলেন, সাধারণত ফ্যাটি লিভারে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। রোগীরা বুঝতেও পারেন না যে, তারা ফ্যাটি লিভারে রয়েছে। তবে কখনও কখনও কিছু রোগীর পেটের ডান পাশে ভোঁতা ধরনের ব্যথা হয়। তবে যদি ফ্যাটি লিভার সমস্যাটি প্রগ্রেস করে তাহলে কারও কারও শারীরিক অবসাদগ্রস্ততা, ক্ষুধামন্দা ও ওজন কমে যেতে পারে। তখন বুঝতে হবে তার লিভারের ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

সচেতনতা বাড়ানো তাগিদ দিয়ে অধ্যাপক ফারুক আহমেদ বলেন, ফ্যাটি লিভারের বিষয়ে আমাদের একটি ভুল ধারণা রয়েছে। আমরা মনে করি, এটি থাকতেই পারে, এতে তেমন কোনো সমস্যা নেই। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। ফ্যাটি লিভার দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগীর ডায়াবেটিস ও রক্তে চর্বিজনিত কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা, সেটা নির্ণয় করতে হবে এবং সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে। পাশাপাশি স্থূলতার ক্ষেত্রে ওজন কমানো ও নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্ত হতে পারে। অন্যথায় ফ্যাটি লিভার থেকে লিভার সিরোসিস এবং একসময় লিভার ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সুতরাং ফ্যাটি লিভার নিয়ে শঙ্কা নয়, তবে অবশ্যই সচেতন হতে হবে।

fatty-liverরাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. ফজল করিম ঢাকা মেইলকে বলেন, লিভার ক্যানসার আগেও আমাদের দেশে ছিল, এখনও আছে। তবে ইদানীং এর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। আমাদের দেশে লিভার ক্যানসারের জন্য প্রধানত হেপাটাইটিস বি ও সি-কে দায়ী করা হয়। তবে হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধে সরকারের নানামুখী প্রচারণা ও জন্মের পরপর টিকা দেওয়ার ফলে তা কমে আসছে। এর বিপরীতে অন্য রোগগুলো যেমন— ফ্যাটি লিভার আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। এ থেকে মানুষ লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে কম্বাইন ইফেক্টে লিভার ক্যানসার বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সারাবিশ্বে লিভার ক্যানসারের অন্যতম কারণ হেপাটাইটিস বি, সি ও অ্যালকোহল। যার মধ্যে দেশে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে নানা কার্যক্রম চলমান আছে। আর আমাদের দেশে অ্যালকোহল গ্রহণের হার খুবই কম। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে ফ্যাটি লিভার বা নন–অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো হেপাটাইটিস (ন্যাশ) লিভার ক্যানসারের তৃতীয় কারণ হিসেবে উঠে আসছে।

সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্তদের একটা অংশ লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। তবে ঠিক কত শতাংশ আক্রান্ত হচ্ছে, সে সংক্রান্ত কোনো জরিপ আমাদের দেশে নেই। দেশে ফ্যাটি লিভার চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। লিভার বিশেষজ্ঞরা ছাড়াও মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা এর চিকিৎসা দিচ্ছেন। তবে ফ্যাটি লিভারের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। বেশিরভাগ রোগী বলেন তাদের পেট ফেঁপে থাকছে বা পেটের উপরিভাগে কিছুটা ব্যথা অনুভব করছেন। আসলে তেমন গুরুতর কোনো লক্ষণ না থাকায় রোগীরা একে গুরুত্ব দেন না। এমনি কি আল্ট্রাসনোগ্রামে ফ্যাটি লিভার ধরা পরলেও রোগীরা ভাবেন এটি খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। একে এতো গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তা ঠিক নয়। এখান থেকে জটিল ন্যাশ, লিভার ফ্রাইটোসিস, সিরোসিস এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। তাই সচেতনতা ও চিকিৎসা গ্রহণের বিকল্প নেই।

fatty-liverখাদ্যাভ্যাস সংশোধন ও কায়িক পরিশ্রম জরুরি

এ বিষয়ে অধ্যাপক ফারুক আহমেদ বলেন, ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণ জীবনযাত্রা প্রণালী। কেউ যদি কায়িক পরিশ্রম, খেলাধুলা বা শারীরিক মুভমেন্ট কম করে তাহলে তার ফ্যাটি লিভার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। খাবারের ক্ষেত্রে কেউ যদি অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করে, মাংসজাতীয় খাবার বেশি খায় তাহলে ঝুঁকি বাড়ে। এমনকি অতিরিক্ত মিষ্টান্ন জাতীয় খাবার গ্রহণের ফলেও ফ্যাটি লিভার দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসায় জোর দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের এই প্রধান বলেন, লিভার সিরোসিস নিজেই ক্যানসারের জন্য একটি রিস্ক ফ্যাক্টর। কারো যদি এটি ধরা পড়ে তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হবে। নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম ও রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে, তার লিভারে টিউমার বা ক্যানসারের কোনো লক্ষণ আছে কিনা। যদি প্রাথমিক অবস্থাতেই রোগ ধরা যায়, তাহলে সহজেই চিকিৎসায় সুস্থতা পাওয়া যায়। কিন্তু তা না করতে পারলে, রোগীকে সুস্থ করা কঠিন হয়ে যায়। তাই কারো যদি ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে হবে। স্থূলকায় হলে ঝুঁকি থাকে। তাদেরও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ডা. ফজল করিম বলেন, ফ্যাটি লিভার বাড়ার কারণ আমরা অধিক হারে ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের দিকে ঝুঁকছি। মানুষের মধ্যে পরিশ্রম করার প্রবণতা কমে গেছে। এমনকি এখন ফোনে অর্ডার করলে ঘরে খাবার চলে আসে। এছাড়া ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলে মতো রোগের মাত্রা বেড়েছে, যা ফ্যাটি লিভার রোগী বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি প্রতিরোধে আমাদের সুষম খাবার খেতে হবে। এমন খাবার খেতে হবে যাতে পর্যাপ্ত কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, প্রোটিন, মিনারেল থাকে। পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করতে হবে। খাবারে ফাইবার বা শাক-সবজির পরিমাণ বাড়াতে হবে। রেড মিট বা গরু-খাসির মাংস যথাসম্ভব কম খেতে হবে।

এমএইচ/এমএইচটি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর