শনিবার, ২৫ মে, ২০২৪, ঢাকা

রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

মাহফুজ উল্লাহ হিমু
প্রকাশিত: ২৩ মার্চ ২০২৩, ১০:৩২ এএম

শেয়ার করুন:

রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বছর ঘুরে চলে এসেছে মুসলিমদের সিয়াম-সাধনার মাস পবিত্র রমজান। এই সময় ভোররাত থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত না খেয়ে রোজা পালন করতে হয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও মৌসুম ভেদে এর সময়কাল ১৪ ঘণ্টা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৩ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। রমজান মানুষকে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে। তবে সচেতনতা অভাব ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ঘাটতিতে এটি বিপদের কারণও হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য। সচেতনতা ও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার ও ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস রোগীরাও সুস্থতার সাথে রমজানে সিয়াম সাধনা করতে পারেন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোজা সঠিকভাবে পালনের জন্য রমজানের অন্তত ৩ মাস আগে থেকে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ডায়াবেটিস রোগীদের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে- রোজার মাধ্যমে একজন মানুষের ইতিবাচক আচরণ ও শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। রোজার পাশাপাশি তারাবির নামাজ পড়লে, বাড়তি ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই। দেশের শতকরা ৮০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী রোজা রাখেন। তবে এদের ৫০ শতাংশেরও বেশি রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়েই রোজা রাখেন। যার ফলে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই জন্য প্রয়োজন প্রস্তুতি আর সচেতনতা।


বিজ্ঞাপন


কারা রোজা রাখতে পারবেন জানতে চাইলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মীর মোশাররফ হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ডায়াবেটিস রোগীদের রমজানে রোজা রাখার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের একটি গাইডলাইন রয়েছে। এখানে একটি স্কোরিং ব্যবস্থাও রয়েছে। এটি ডায়াবেটিস রোগীদের ডায়াবেটিসের ধরন, রোগের ইতিহাসসহ নানা বিষয় বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়। কারো স্কোর যদি ৬.৫ বা তার বেশি হয় তাহলে সে ব্যক্তির রোজা রাখা একদম উচিত হবে না। এটি তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। কারো স্কোর যদি ৩.৫ থেকে ৬ পর্যন্ত হয় তাহলে তাদের রোজা রাখাটা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সে যদি রাখতে চায় তাহলে সাবধানতার সাথে রোজা রাখতে পারবে। আর যদি তা ৩ এর মধ্যে হয়, ওই ব্যক্তির ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে এবং মুখে খাওয়া ওষুধের মাধ্যমেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে- তারা রাখতে পারে। এতে তেমন ঝুঁকিও নেই। 

এক্ষেত্রে যদি কোনো মানুষের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। যদি তার এডভান্সড কিডনি রোগ, হার্টের কোনো রোগ, বয়স্ক লোক মানুষ (যাদের স্মৃতিজনিত সমস্যা আছে) হাইপোগ্লাইসেমিয়া রয়েছে  (যাদের ডায়াবেটিস দ্রুত কমে যায়) অথবা জটিলতাজনিত কোনো কারণে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে তাদের রোজা থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের স্কোরই সাধারণত ৬ দশমিক ৫ বা তার বেশি হয়ে থাকে।

ramadan

যে উপায়ে প্রস্তুতি ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে নিতে হবে
জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এক কোটি ১০ লাখ। এদের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের সংখ্যা ২৬ লাখ আর ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা ৮৪ লাখ। তবে শঙ্কার বিষয় দেশে মোট আক্রান্তের ২৫ শতাংশ জানেনই না তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। 


বিজ্ঞাপন


এ অবস্থায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতি, অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল অ্যান্ডোক্রাইনোলোজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অব বাংলাদেশ (এসেডবি)-সহ বিভিন্ন সংগঠন ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য গাইডলাইন প্রস্তুত করেছে। যা মানার মাধ্যমে একজন ডায়াবেটিস রোগীও রোজা রাখতে পারবে। 

এ বিষয়ে অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন বলেন, ডায়াবেটিস রোগীদের রোজার দুই থেকে তিনমাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। রমজানের আগেই তাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। রমজানে যে নির্দিষ্ট সময় রয়েছে তা পরিবর্তন হয়ে যায়। এমনকি ওষুধ খাবারের সময়েও পরিবর্তন আসে। এ জন্য প্রথমত ভালোভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রোজা থাকা অবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা  মনিটর করতে হবে। 

ডায়াবেটিস মনিটর ও খাবার গ্রহণ
রমজানে ডায়াবেটিস রোগীরা সবথেকে বেশি যে সমস্যায় পড়েন তা হলো, তাদের খাবার ও ওষুধ গ্রহণের সময়। তাই অবশ্যই সাধারণ মানুষের তুলনায় ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যের বিষয়ে বিশেষ সতর্ক হতে হবে বলে জানান অধ্যাপক মোশাররফ। তিনি বলেন, রমজানে ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের শরবত খাওয়াত একটি প্রথা রয়েছে। ইফতারে একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে মিষ্টিজাতীয় খাবার। কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীদের এ ধরনের খাবার খাওয়া যাবে না। তারা লেবুর শরবত, ডাবের পানি বা যে খাবারে চিনি গুড়ের উপস্থিতি নেই সেই খাবার খেতে পারবেন। মিষ্টি ফল যেমন, তিনটি খেজুর তারা খেতে পারবেন। এছাড়া সীমিত পরিমাণ আপেল, কমলা খেতে পারবেন। একই সঙ্গে ছোলাবুট, পেঁয়াজু, বেগুনি অল্প পরিমাণে খেতে পারবে। তবে এসবের মাত্রা একেকজন রোগীর জন্য একেক রকম। প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্যে  ক্যালরি পরিমাপ করে খাওয়া যেতে পারে। সেহরি যতটা সম্ভব দেরি করে করতে হবে। রাতে অধিক পরিমাণ পানি পান করতে হবে।

ডায়াবেটিস মনিটরিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা রোগীদের নিয়মিত ডায়াবেটিস মনিটরিং করতে বলি। রোজায় সকালে, বিকেলে এবং ইফতারের পর একবার করে সুগার মাপা উচিত। এর মধ্যে বিকালেরটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি কখনও কারো সুগারের মাত্রা ১৬ দশমিক ৫০ এর উপর হয় অথবা ৩ দশমিক ৯০ এর কম হয় তাহলে রোজা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। রোগীদের ওষুধের ডোজ চিকিৎসকে পরামর্শ অনুযায়ী এডজাস্ট করতে হবে। আমরা রোগীদের ইফতারের পর ওষুধ নিতে বলি। যারা দুইবেলা ওষুধ খান তাদের সেহরি ও ইফতারে ওষুধ খেতে বলি। কিছু কিছু ইনসুলিনের ডোজ এডজাস্ট করতে হয়।

এ ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের আলেমরা একমত যে রোজা থাকা অবস্থায় ইনসুলিন নেওয়া যাবে। রোগীকে আমরা এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেই। এ সময় তারা কি করে তাদের ওষুধগুলো চালু রাখতে পারে সে বিষয়ে পরামর্শ দেই। আমরা তাদের পুরোপুরি ডায়েট চার্ট দেওয়ার পর কিছু রোজা পরীক্ষামূলকভাবে রাখার পরামর্শ দেই। এছাড়া রমজানে ব্যায়াম স্বাভাবিক রাখতে হবে। আমরা তাদের সরাসরি বলে দেই যে, দিনের বেলা এটি করা যাবে না। আমরা রাতে ব্যায়াম করার পরামর্শ দেই এবং তারাবির নামাজটিকে ব্যায়ামের অংশ হিসেবে বিবেচনা করি।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় বিশেষ সতর্কতা
দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার ফলে ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তের শর্করার পরিমাণ অতিরিক্ত কমে যেতে পারে; যেটি হাইপোগ্লাইসেমিয়া নামে পরিচিত। রক্তের শর্করার পরিমাণ ৩ দশমিক ৯০ এর নিচে নেমে গেলে তাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে। যাদের হাইপোগ্লাইসেমিয়া রয়েছে তাদের এটি থেকে বাঁচতে ডায়াবেটিস মনিটরে জোর দিতে হবে। এ ধরনের অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে শরবত বা মিষ্টি জাতীয় কিছু মুখে দিতে হবে এবং রোজা ভেঙ্গে ফেলতে হবে বলেও জানান অধ্যাপক ডা. মীর মোশাররফ হোসেন। একই সঙ্গে হাইপারগ্লাইসিমিয়া বা রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।

এমএইচ/একে

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর