পোড়া রোগীদের আশার আলো শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট

প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:৩০ পিএম
পোড়া রোগীদের আশার আলো শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট
ফাইল ছবি

প্রতি বছর দেশে আগুনে দগ্ধ হন অসংখ্য মানুষ। বাসা-বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড, গ্যাস লাইন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ কিংবা কল-কারখানায় অগ্নিকাণ্ড- নানাভাবে দগ্ধ হন মানুষ। কয়েক বছর আগেও দেশে আগুনে পোড়া রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। তার সঙ্গে পোড়া রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে অসচেতনতা। ফলে আগুনে পোড়াদের অনেকেই অকালে মারা যান অথবা সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন।

এমন অবস্থা ২০১৯ সালে স্থাপিত হয় দেশের প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, যা দেশের পোড়া রোগীদের চিকিৎসায় আশার আলো দেখাচ্ছে।

Sheikh Hasina Burn Institute3এই ইনস্টিটিউটে রয়েছে তিনটি উইং- বার্ন ইউনিট, প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট এবং একাডেমিক ইউনিট। এই তিনটি উইংয়ের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন বিশেষজ্ঞ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এই ইনস্টিটিউট। এক সময় আগুনে পোড়ার পর মনে করা হতো স্বাভাবিক জীবনের শেষ, সেখানে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট।

যেভাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল

শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট স্থাপনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ, যার শুরু ১৯৮৬ সালে দেশের প্রথম প্লাস্টিক সার্জন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর হাত ধরে। তিনি প্রথম ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেন। তখন এর শয্যার সংখ্যা ছিল মাত্র ছয়টি। পরে অধ্যাপক ডা. সামন্ত লালের প্রচেষ্টায় ২০০৩ সালে ঢামেক হাসপাতাল চত্বরে স্বতন্ত্র ৬ তলা ভবনে ৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ইউনিটের কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে এর শয্যা সংখ্যা ১০০ তে উন্নীত করা হয়।

তবে এ উদ্যোগের টার্নিং পয়েন্ট ২০১০ সাল, ওই বছরের ৩ জুন পুরাতন ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৭ জনের মৃত্যুর পর। পরবর্তীতে নির্বাচন-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতা ও দেশের বিভিন্ন কলকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের কারণে একটি পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিটের দাবি জোরালো হয়। ২০১৩ সালে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের শয্যাসংখ্যা ৩০০ তে উন্নীত করা হয়। একইসঙ্গে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

Sheikh Hasina Burn Instituteএর ধারাবাহিকতায় ঢামেক হাসপাতালের পাশে চাঁনখারপুলের টিবি হাসপাতালকে মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সাথে সংযুক্ত করে ওই জমিতে ৫০০ শয্যার ইন্সটিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। ২০১৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় প্লাস্টিক সার্জারি বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মানের একটি বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট স্থাপনের ঘোষণা দেন। ওই বছরের নভেম্বরে প্রস্তাবটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। ২০১৬ সালের ৬ এপ্রিল চাঁনখারপুলে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। একই বছরের ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর ইনস্টিটিউটের নির্মাণ কাজ শুরু করে। ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। ২০১৯ সালের ৪ জুলাই প্রতিষ্ঠানতে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা শুরু হয়।

অবকাঠামো ও সেবার পরিধি

৫০০ শয্যা বিশিষ্ট শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ২২ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), উন্নত চিকিৎসার জন্য ২২ শয্যার হাই ডেফিসিয়েন্সি ইউনিট (এইচডিইউ), ১২টি অপারেশন থিয়েটার এবং একটি অত্যাধুনিক পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড রয়েছে। দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি জন্মগত ঠোঁটকাটা, তালুকাটাসহ বিভিন্ন রোগীদের প্লাস্টিক ও রিকন্সট্রাক্টিভ সার্জারিরও ব্যবস্থা আছে। রোগীকে দ্রুত আনা-নেওয়ার জন্য দেশের প্রথম সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাসপাতাল ভবনের ছাদে রয়েছে হেলিপ্যাড। এছাড়া ১৮০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

হাসপাতালটির পরিচালক অফিসের তথ্য মতে, ২০২১ সালে হাসপাতালটিতে মোট ৪৫ হাজার ৭২৩ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ওই বছরের মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮১৫ জন রোগী বিভিন্ন ধরনের সেবা পেয়েছেন। ওই বছরে বহির্বিভাগ ও অন্তঃবিভাগে নানা সেবার পাশাপাশি ৩ হাজার ৯১৫ জনকে নামমাত্র মূল্যে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

Sheikh Hasina Burn Institute২০২২ সালে হাসপাতালটি থেকে ৫৫ হাজার ৮১৬ জন সেবা পেয়েছেন। এরমধ্যে ৪ হাজার ৯১৮ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। এ বছরের মার্চে সর্বাধিক ৪৭২ জন এবং ডিসেম্বরে ৪৫৩ জন অস্ত্রোপচার করা হয়।

সেবা দেওয়ার পাশাপাশি দেশে বার্ন সার্জন ও বিশেষজ্ঞ তৈরিতেও কাজ করে যাচ্ছে হাসপাতালটি। এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম ঢাকা মেইলকে বলেন, এই ইনস্টিটিউট ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও আমরা কাজ শুরু করেছি ২০১১ সাল থেকে। এখন পর্যন্ত আমরা ১৫০ জন প্লাস্টিক সার্জন তৈরি করতে পেরেছি। তবে প্রয়োজন আরও বেশি। আমাদের অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ বার্ন সার্জন প্রয়োজন। এখানে বিষয় হচ্ছে- চাইলেই এসব জনবল তৈরি করা যায় না। দক্ষ জনবল তৈরিতে সময় প্রয়োজন। এ অবস্থায় হাসপাতালে অপারেশনে কিছুটা সময় লাগছে। তবে এটা খুব বেশি সমস্যা তৈরি করছে না।

সারাদেশে বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য

পোড়া রোগীদের ভোগান্তি কমাতে ও ঢাকা-কেন্দ্রিক চাপ কমাতে সারাদেশে এর চিকিৎসা ছড়িয়ে দেওয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করেন বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম। এ লক্ষ্যে কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, রোগীদের ৮০ শতাংশ ঢাকার বাইরে থেকে আসে। এসব রোগীকে আমরা জটিল অবস্থায় পাই। কারণ তাদের বেশিরভাগই প্রাথমিক চিকিৎসা পায় না। আবার অনেকেই প্রাথমিকভাবে কিছু ভুল চিকিৎসা পায়। যেমন- পোড়াস্থানে কাঁচা ডিম, টুথপেস্ট, চুন ইত্যাদির ব্যবহার, যা রোগীর জটিলতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এসব রোধে প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায়ে বার্ন সেবা পৌঁছানো।

Sheikh Hasina Burn Instituteতিনি আরও বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে বার্নের চিকিৎসা পৌঁছানো একদিনের কাজ নয়। এটি করতে দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত চেষ্টা প্রয়োজন। এখন প্রায় প্রত্যেক জেলায় মেডিকেল কলেজ হয়েছে। এসব হাসপাতালে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট চালু করতে হবে। এরমধ্যেই অনেক হাসপাতালে চালু হয়েছে। যেগুলোতে নেই সেখানে এডজাস্ট করে পাশের মেডিকেলে সেবা দিতে হবে। ইতিমধ্যে অনেক সাব-সেন্টার করা হয়েছে।

অধ্যাপক আবুল কালাম বলেন, আমাদের বার্ন সেন্টারের স্ট্রাকচার যুক্তরাজ্যের আদলে করা, যা সর্বাধুনিক ও কার্যকর। এখন যে মেডিকেল কলেজগুলোতে ইউনিট রয়েছে তারা যদি চিকিৎসকদের তিনদিনের একটা ওরিয়েন্টশন ক্লাস করায় তাহলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ওই চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু দিতে পারবেন। তাহলে ঢাকা-কেন্দ্রিক রোগীর চাপ ও ভোগান্তি কমে আসবে।

এমএইচ/জেএম