করোনা টিকার চতুর্থ ডোজ কেন প্রয়োজন?

প্রকাশিত: ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:৪৫ এএম
করোনা টিকার চতুর্থ ডোজ কেন প্রয়োজন?

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি পুরো বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তের হার গত কয়েক মাস ধরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। গত এক মাস টানা মৃত্যুশূন্য দিনের পাশাপশি সংক্রমণের হারও প্রায় সবসময়ই এক শতাংশের নিচে ছিল। এর অন্যতম কারণ দেশের মোট জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশের বেশি মানুষকে বিনামূল্যে করোনার টিকা প্রদান। সারাদেশে করোনার মোট তিন ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে এবং এ কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। তবে এরই মধ্যে করোনার চতুর্থ ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সম্প্রতি সম্মুখসারির যোদ্ধা, ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি এবং গর্ভবতীদের করোনা টিকার চতুর্থ ডোজ দেওয়ার সুপারিশ করে জাতীয় টিকা সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, আমাদের হাতে টিকা আছে। চতুর্থ ডোজ টিকা দেওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। টিকা দেওয়ার ব্যাপারে টেকনিক্যাল কমিটিরও সম্মতি আছে।

আগামী ২০ নভেম্বর থেকে চতুর্থ ডোজ দেওয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর।

দেশের টিকা পরিস্থিতি

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন শাখার (এমআইএস) তথ্য মতে, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে টিকা কার্যক্রমের শুরুর পর ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকার প্রথম ডোজের আওতায় এসেছেন ১৪ কোটি ৮৮ লাখ ১২ হাজার ১৮৬ জন। দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন ১২ কোটি ৬৪ লাখ ২ হাজার ৭৭৪ জন। এ সময়ে টিকার বুস্টার (তৃতীয়) ডোজ পেয়েছেন ছয় কোটি ৩৯ লাখ ৭৭ হাজার ২২ জন।

অধিদফতরের হিসেব মতে প্রথম ডোজ যারা নিয়েছেন তাদের ৮৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ মানুষ দ্বিতীয় ডোজের টিকা পেয়েছেন। আর বুস্টার ডোজ পেয়েছে ৪২ দশমিক ৯৯ শতাংশ মানুষ। দ্বিতীয় ডোজের তুলনায় ৫০ দশমিক ৬১ শতাংশ মানুষ বুস্টার ডোজ পেয়েছেন।

অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের তুলনায় বুস্টার ডোজের হার এখনও যথেষ্ট কম। এ অবস্থায় চতুর্থ ডোজের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ অবস্থায় অনেকের মনে প্রশ্ন- করোনা টিকার চতুর্থ ডোজ কেন প্রয়োজন?

যে কারণে দেওয়া হচ্ছে চতুর্থ ডোজ

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপারিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, আমরা ষাটোর্ধ্ব ও সম্মুখসারির যোদ্ধাদের চতুর্থ ডোজ টিকা দেওয়ার চিন্তা করছি। প্রাথমিক অবস্থায় এসএমএসের মাধ্যমে নির্ধারিত ব্যক্তিদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে জানানো হবে। টিকা নেওয়ার চার মাস পর সাধারণত অ্যান্টিবডির মাত্রা কমে যায়। এই কারণে চতুর্থ ডোজ টিকা দেওয়ার সিন্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি চীনসহ বিভিন্ন দেশে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চতুর্থ ডোজের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রখ্যাত সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, এটা আমরা আগেও দেখেছি, কিছুদিন করোনা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকে। কিন্তু নতুন করে আরেকটা ঢেউও দেখা যায়। এখন কয়েক মাস বিশেষ করে গত কয়েক সপ্তাহে আমরা অনেক ভালো অবস্থায় আছি। কিন্তু আরেকটা ঢেউ আসবে না, সেটা বলা কঠিন। করোনার আরেকটি ঢেউ আসতে পারে। তাই ভালো অবস্থা থাকতে থাকতে যাদি আমরা ভ্যাকসিনটা আরও বেশি মানুষকে দিতে পারি তাহলে আমাদের উপকার হবে। এতে মানুষকে অগ্রিম করোনা রোধে সক্ষম করা সম্ভব হবে।

চীনে ফের করোনা বাড়ার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, চীনে সংক্রমণ বেড়েছে বলে আমরা জানতে পারছি। কিন্তু চীনের প্রকৃত অবস্থা এখনই বোঝা কঠিন। চীন এসব নতুন নতুন ভাইরাসের প্রজনন ক্ষেত্র। এখন যেটা ছড়াচ্ছে সেটা আসলে কোন ভ্যারাইটির, সে সংক্রান্ত কোনো রিপোর্টও আমরা পাইনি। তাই আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। সাধারণত এয়ারপোর্টের মাধ্যমে এসব রোগ দেশে ছড়ায়। তাই প্রয়োজনে সেখানে সতর্কতা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি ভ্যাকসিনেশন নিশ্চিত করতে হবে এবং আমাদের এন্টিবডি পর্যাপ্ত রাখতে হবে।

যে প্রক্রিয়ায় দেওয়া হবে চতুর্থ ডোজ

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, আগামী ২০ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে করোনার চতুর্থ ডোজ দেওয়া শুরু হবে। প্রাথমিক অবস্থায় সাতটি সেন্টারে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ফ্রন্ট লাইনারদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ টিকা দেওয়া হবে। এসএমএসের মাধ্যমে যাদের নির্বাচিত করা হবে, শুধুমাত্র তারাই কেন্দ্রে যাবেন।

নির্ধারিত প্রতিটি হাসপাতালে ১০০ জন করে টিকা দেওয়া হবে। এরপর দুই সপ্তাহ তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। টিকা পাওয়া ব্যক্তিদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে সারাদেশে ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের টিকার চতুর্থ ডোজ দেওয়া হবে।

প্রাথমিক অবস্থায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

এমএইচ/জেএম/এএস