ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল

রোগীর প্রচণ্ড চাপ, সেবা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

প্রকাশিত: ১০ নভেম্বর ২০২২, ০৭:৫৬ এএম
রোগীর প্রচণ্ড চাপ, সেবা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল হাসপাতালে ১১ দিন চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পান যাত্রাবাড়ীর মনিরুল ইসলাম। ৪০৫ টাকা দিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করান। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সবকিছু নিজের খরচে করলেও হাসপাতালটির সেবা ও খাবারের মান নিয়ে সন্তুষ্ট তিনি। মনিরুল বলেন, হাসপাতাল তো সরকারি না। ৬শ টাকা বেড ভাড়াসহ সব নিজেদেরই খরচ করতে হয়। তারপরও অন্য হাসপাতালের চেয়ে খরচ খুব বেশি না। ডাক্তাররাও আন্তরিক।

অন্যদিকে গেন্ডারিয়ার সুমীর অভিজ্ঞতা মনিরুলের চেয়ে ভিন্ন। মাকে নিয়ে তিনদিন হাসপাতালটির ছয়তলায় মহিলা ওয়ার্ডে অবস্থান করা সুমী জানালেন, খরচ খুব বেশি না হলেও স্টাফদের ব্যবহার কিছুটা রূঢ়। প্রয়োজনের সময় ডাক্তার খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে রাতের বেলায়।

সম্প্রতি রাজধানীর জনসন রোডের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে সরেজমিন ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। তবে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশারি ব্যবহারে চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে।

ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে
হাসপাতালটির চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্য সময়ের চেয়ে এবার আগেভাগে ডেঙ্গু রোগী আসতে শুরু করেছে। গত দুইমাস এই চাপ ক্রমাগত বেড়েছে। বিশেষ করে অক্টোবর মাসে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে বাড়তি বিছানার ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

আরও পড়ুন: এক সপ্তাহেই ছুঁয়েছে মাসের রোগী

হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে এখানে ১৯৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে ৯৫ জন পুরুষ ও ৭৫ জন মহিলা। আর ২৩ জন শিশু চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন।

dengue

অন্যদিকে অক্টোবরে সেপ্টেম্বরের দ্বিগুণেরও বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছে হাসপাতালটিতে। অক্টোবরে ৪৪৪ জন রোগী ভর্তি ছিল। যাদের মধ্যে ২০৫ জন পুরুষ। ১৬০ জন নারী। ৭৯ জন শিশু। সবাই অবশ্য চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। চলতি নভেম্বরের প্রথম ছয় দিনে ৪১৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৯ নভেম্বর পর্যন্ত চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৮৭ জন, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আর এই মাসের ৯ দিনে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৭ হাজার।

চলতি বছরে ১ জানুয়ারি থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সর্বমোট ৪৫ হাজার ৫৯৮ জন।

কেন এত রোগীর চাপ?
সারা দেশে যখন ডেঙ্গু রোগীর চাপ কম তখন শুরু থেকেই ঢাকায় রোগী বেশি শনাক্ত হয়েছে। এরমধ্যে আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ঢাকা উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড ঝুঁকিতে আছে- এমনটাও উঠে এসেছে।

ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্টার ডা. মেহেদী হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, পুরান ঢাকা অন্য এলাকার চেয়ে কিছুটা ঘিঞ্জি। বাসা-বাড়ির আশপাশও কম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। যে কারণে হয়তো মশার উপদ্রব বেশি। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে যাত্রাবাড়ি, শ্যামপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়ার দিকের লোকজন আছে।

হাসপাতালেও মশারি ব্যবহারে অনীহা
হাসপাতালটিতে ঘুরে দেখা যায়, ছয়তলার পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডের বেশিরভাগ বিছানায় ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্য রোগীদেরও চিকিৎসা চলছে এই দুই ওয়ার্ডে। এর বাইরে যারা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তাদের মূল ভবনের পাশের নতুন বিল্ডিংয়ের এইচডিউতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন: সোহরাওয়ার্দীতে রোগীর চাপ কম, বেড খালি

তবে ডেঙ্গু থেকে নিরাপদে থাকতে মশারি ব্যবহারে যেখানে জোর দেয়া হচ্ছে, সেখানে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু আক্রান্তদের মশারি ব্যবহারে অনীহা দেখা গেছে। নারী-পুরুষ কোনো রোগীকেই মশারি ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। এমনকি রাতেও অনেকে মশারি ব্যবহার করেন না বলে জানা গেছে।

dengue

অবশ্য এজন্য অদ্ভুত যুক্তি আছে রোগী ও স্বজনদের। মশারি ব্যবহারে অনীহা কেমন এমন প্রশ্ন করলে গেন্ডারিয়া থেকে আসা মাসুদা আক্তার ঢাকা মেইলকে বলেন, মশারি টানালে ফ্যানের বাতাস লাগে না।দম বন্ধ হয়ে আসে।

এদিকে সরকারি পর্যায়ে হাসপাতালগুলোতে রোগীদের বিনামূল্যে মশারি দিলেও এই হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম মশারি দেয়া হয় বলে জানা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মশারি দেয়ার কথা দাবি করলেও একাধিক রোগীর স্বজন জানিয়েছেন হাসপাতাল থেকে কোনো মশারি পাননি।

রোগীদের জন্য কি করছে ন্যাশনাল হাসপাতাল?

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেসরকারি হাসপাতাল হলেও এতে সরকারের সহযোগিতা আছে। সেক্ষেত্রে নিজেদের সাধ্যের মধ্যে রোগীদের জন্য সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সাধারণ বেডের ৬০০ টাকা ভাড়ার সঙ্গে তিন বেলা খাবার পরিবেশন করা হয়। চেষ্টা করা হয় মানসম্পন্ন খাবার সরবরাহের।

nurun-nabi

পাশাপাশি কোনো রোগী যাতে ফেরত না যায় সেজন্য প্রয়োজনে অতিরিক্ত বিছানার ব্যবস্থা করে চিকিৎসা দেয়া হয়। একেবারেই অস্বচ্ছল রোগীদের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কিছুটা ছাড়, কখনো বিনামূল্যেও করা হয় বলে জানা গেছে।

হাসপাতালটির সহকারী পরিচালক ডা. এ কে এম নুরুন-নবী ঢাকা মেইলকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেক বেশি। তারমধ্যেও আমরা কাউকে ফেরত দিচ্ছি না। রোগীরাও সেবায় যেন সন্তুষ্ট থাকে সেজন্য সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করছি।

বিইউ/এএস