ডেঙ্গুঝুঁকিতে ঢাকার যেসব ওয়ার্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:৫০ এএম
ডেঙ্গুঝুঁকিতে ঢাকার যেসব ওয়ার্ড

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে আশংকাজনকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। প্রতিদিনই সংক্রমনের পরিসংখ্যাণ ছাড়াচ্ছে আগের দিনের রেকর্ড। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক জরিপ বলছে রাজধানী ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৩টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪ টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। 

এসব ওয়ার্ডে ১২ শতাংশের বেশি বাড়িতে ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। গত ১১-২৩ আগস্ট ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ৯৮টি ওয়ার্ডে ওই জরিপ চালানো হয়। এ সময় ১১০টি সাইটের ৩ হাজার ১৫০টি বাড়ি পরিদর্শন করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের জরিপ দল।

গতকাল বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন ভবনে মশা নিয়ে বর্ষাকালীন জরিপের ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ৯৮টি ওয়ার্ডের ৩ হাজার ১৫০টি বাড়ির মধ্যে ৩৯২টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে; যা মোট বাড়ির ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির ২১৫ ও উত্তর সিটির ১৭৭টি বাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেছে। ২ হাজার ৭৫৮টি বাড়িতে এডিস মশার কোনো লার্ভা পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, কোনো এলাকায় এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয় ব্রুটো ইনডেক্সের মাধ্যমে। এই ইনডেক্স ২০-এর বেশি হলেই তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। এ হিসাবে ঢাকা উত্তরের ১, ১১, ১৪, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২৪, ২৮, ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ওয়ার্ডের আওতায় রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মহাখালী, বনানী, গুলশান, বাড্ডা, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর এলাকা পড়েছে। আর ঢাকা দক্ষিণের ৭, ৮, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ২৪, ৩৪, ৩৮, ৩৯, ৪১, ৪২, ৪৮ ও ৫১ নম্বর ওয়ার্ড ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ওয়ার্ডের মেধ্যে মানিকনগর, খিলগাঁও, মালিবাগ, শাহজাহানপুর, শান্তিনগর, হাজারীবাগ, লালবাগ, সিদ্দিকবাজার, কাপ্তানবাজার, ওয়ারী, সূত্রাপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকা রয়েছে। এ ছাড়া উত্তর সিটির ১৪ এবং দক্ষিণের ২২টি ওয়ার্ডের ব্রুটো ইনডেক্স ১০-এর বেশি। ১০-এর কম ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে উত্তরের ১২ ও দক্ষিণের ২১ ওয়ার্ডে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানীতে নির্মাণকাজ বেড়ে গেছে, বিভিন্ন উন্নয়নকাজ চলছে। থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় বর্ষাকালে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন বাড়ির প্লাস্টিকের ড্রাম, বালতি, জলাবদ্ধ মেঝে, ফুলের টবে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পানির ট্যাংক, পরিত্যক্ত টায়ার, ছাদবাগান এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমরা মশার লার্ভা পাইনি।’

অনুষ্ঠানে আলোচকরা বলেন, আগে আমরা ছাদ বাগানের জন্য উৎসাহ দিতাম। আর সেটা এখন ক্যানসারে পরিণত হয়েছে। যাদের বাসার ছাদবাগান আছে তাদের প্রত্যেকের বাসার লার্ভা পাওয়া গেছে। এমনকি আমরা তাদের বাসায় শোবার ঘরে, ডাইনিং ও বাথরুমেও লার্ভা পেয়েছি। তারা বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সবাইকে অংশগ্রহণ করতে হবে। নিজ নিজ এলাকার সড়কগুলো নাগরিকদের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। কীভাবে পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখবে সেটা তাদের দায়িত্ব। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে জানান তারা।

অনুষ্ঠানে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় জাতীয় গাইডলাইন প্রস্তুতকারী দলের প্রধান ডা. কাজী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ১০ বছর ধরে একই কথা বলে আসছি। ডেঙ্গু চিকিৎসা ও মোকাবিলায় আমাদের কোনো উন্নতি হয়নি। ডেঙ্গুর গাইডলাইন ফলো করলে ৯০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসা বাড়িতেই দেওয়া যেত। সে ক্ষেত্রে এ বছর ভর্তিযোগ্য রোগীর সংখ্যা এক থেকে দেড় হাজার হতো।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, ‘আমরা মশা মারতে গিয়ে পরিবেশ নষ্ট করছি। আমাদের প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মোকাবিলা করতে হবে। এতে পরিবেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের দেশেও প্রাকৃতিক উপায়ে মশা মারার পরিকল্পনা আছে।’ সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলমসহ সিটি করপোরেশন এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা।

৪০০-এর ঘরে ডেঙ্গু রোগী : ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৩১ জন ভর্তি হয়েছে। এ সময় ডেঙ্গুতে মারা গেছে একজন। এ নিয়ে এ বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল মোট ১২ হাজার ৪৩৮ জন ও মোট মারা গেল ৪৬ জন।

গত দুদিন ধরে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৪০০-এর ঘরে রয়েছে। এর আগে এ বছর আর কখনোই দৈনিক রোগীর সংখ্যা ৪০০-এর ঘরে ওঠেনি। এর আগে এক দিনে এর চেয়ে বেশি ৩৯৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছে ১৮ সেপ্টেম্বর। গত মঙ্গলবার ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৩৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ৩২৮ জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ও ঢাকার বাইরে ১০৩ জন ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১ হাজার ৫৫৭ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার ৫০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে ১ হাজার ১৯০ জন ও ঢাকার বাইরে ৩৬৭ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেঙ্গুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছর গত মে থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে। এপ্রিলে যেখানে ভর্তি হয়েছিল ২৩ জন, সেখানে মে মাসে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৩ জনে। এরপর জুনে ৭৩৭ জন, জুলাইয়ে ১ হাজার ৫৭১ জন, আগস্টে ৩ হাজার ৫২১ জন ও সেপ্টেম্বরের গত ২০ ২১ দিনে ৬ হাজার ২৫৭ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

/ একেবি/