রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ক্যানসার গবেষণা বাড়াতে বিএমইউতে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটের প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ক্যানসার গবেষণা বাড়াতে বিএমইউতে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটের প্রস্তাব
বিএমইউর শহীদ ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠক

দেশে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়লেও গবেষণা, দক্ষ জনবল ও আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এখনও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা, সময়মতো চিকিৎসা শুরু এবং বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে রোগীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও উন্নতি প্রয়োজন। 

এ পরিস্থিতিতে ক্যানসার চিকিৎসা, উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণাকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনতে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর বিএমইউর শহীদ ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ প্রস্তাব উঠে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সহযোগিতায় এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এতে চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক, ওষুধশিল্প ও চিকিৎসাপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু এসব সুবিধা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি, নিয়মিত গবেষণা, নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়। একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা গেলে এসব কাজ একই ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনা করা সহজ হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ক্যানসার চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য উচ্চতর চিকিৎসাশিক্ষা, দক্ষ জনবল তৈরি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিএমইউতে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা গেলে ক্যান্সার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি হবে। একই সঙ্গে উন্নত চিকিৎসা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা ও নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়বে।

বিএমইউকে ক্যানসার শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশাও জানান উপাচার্য।

রোগ শনাক্তে দেরি কমানোর তাগিদ

বৈঠকে ক্যানসার প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্যানসার অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে সময়মতো চিকিৎসা শুরুর সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় অনেকেই দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসেন।

এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) টিকাদান, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সারের নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মানুষকে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিলেই হবে না, পরীক্ষার সুবিধাও সহজলভ্য করতে হবে। পাশাপাশি পরীক্ষায় ক্যান্সার শনাক্ত হলে রোগী যেন দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দেশে ক্যানসারের প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার নিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবও আসে বৈঠকে। 

বক্তারা বলেন, দেশে কত মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, কোন ধরনের ক্যানসার বেশি হচ্ছে এবং কোন এলাকায় রোগটির প্রকোপ কেমন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা জরুরি। সঠিক তথ্য ছাড়া চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ কঠিন।

সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান

বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বৈঠকে বিভাগের কার্যক্রম, অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, একজন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় অনেক সময় একাধিক বিভাগের বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয়। এ জন্য ক্লিনিক্যাল অনকোলজি, মেডিক্যাল অনকোলজি, সার্জিক্যাল অনকোলজি, প্যাথলজি, রেডিওলজি, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও মেডিক্যাল ফিজিকস বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

বৈঠকে রোগীর চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণে বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ডের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমন্বিতভাবে রোগীর অবস্থা পর্যালোচনা করা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি বেছে নেওয়া সহজ হয়।

এ সময় রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির ব্যবহার এবং এসব বিষয়ে গবেষণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বক্তারা বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতাও থাকতে হবে। এ জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পাশাপাশি মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, প্রশিক্ষিত নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা জরুরি।

শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভর না করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও বিশেষায়িত ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তারা। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ ও পরিকল্পিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতকে যুক্ত করার প্রস্তাব

ক্যানসার গবেষণায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য বিজ্ঞানের ভূমিকা বাড়ছে। বিশেষ করে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল ফিজিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন চিকিৎসাপ্রযুক্তি নিয়ে যৌথ গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

এ জন্য বিএমইউর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষকদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ওষুধশিল্প ও চিকিৎসাপ্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়।

বক্তারা বলেন, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বিএমইউ এবং অন্যান্য বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। এতে বিদ্যমান সম্পদ ও দক্ষতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

ক্যানসার সচেতনতায় গণমাধ্যমের ভূমিকা

বৈঠকে ক্যানসার নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে গণমাধ্যমের ভূমিকার কথাও উঠে আসে।

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক এজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম শুভসহ সংগঠনের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।

বক্তারা বলেন, ক্যানসার সম্পর্কে ভুল ধারণা ও সচেতনতার অভাবে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ, প্রতিরোধের উপায় এবং আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্য সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালের ১৯ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ। বর্তমানে বিভাগটিতে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপিসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্নাতকোত্তর শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্যানসার প্রতিরোধ থেকে শুরু করে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও গবেষণাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে দেশের ক্যান্সার চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়বে। এ লক্ষ্যেই বিএমইউতে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তারা।

এমএইচ/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর