চার বছর বয়সী শিশু ওয়াইস কুরুনী আভানের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছে তার পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে ভুল তথ্য ও ভুল চিকিৎসার কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আভানের বাবা মৃদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, হাসপাতালে নেওয়ার আগে এবং ভর্তির পরও শিশুটির ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ ছিল। ২৭ সেপ্টেম্বরের পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ এবং প্লাটিলেট ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি ছিল। ২৯ সেপ্টেম্বর ইউনিভার্সাল হাসপাতালে নেওয়ার পরও ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসে এবং প্লাটিলেট ছিল ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি।
মৃদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে নেওয়ার সময় শিশুটির জ্বর ছিল না। তখন তার তাপমাত্রা ছিল ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট, রক্তচাপ ১০০/৭০ এবং পালস ১২০।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বক্তব্য ও ভিডিওতে শিশুটির জ্বর ও পেটব্যথার কথা বলেছে দাবি করে মৃদুল ইসলাম বলেন, এসব তথ্য সঠিক নয়। হাসপাতালের লিখিত বক্তব্য ও ভিডিও বক্তব্যের মধ্যেও অমিল রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শিশুটির নাক দিয়ে রক্ত পড়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসপাতালে এটিকে নেজাল ব্লিডিং হিসেবে উল্লেখ করা হলেও রক্তপাতের কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
মৃদুল ইসলাম বলেন, তার সন্তানকে হারানোর ঘটনায় তারা বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দেবেন। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের রোগী ও স্বজনদের প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
পরিবারের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল, দায়ী চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে আভানের মা ফাহমিদা তমাসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
আভানের মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একপেশে, খণ্ডিত ও ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেছে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, শিশুটির চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়েছে এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের বিবৃতিতে বলা হয়, ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে চার বছর বয়সী আভান জ্বর, নাক দিয়ে রক্তপাত ও হেমোরেজিক ডেঙ্গুর সন্দেহ নিয়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসে। পিআইসিইউতে কর্তব্যরত সিনিয়র ডিউটি স্পেশালিস্ট ডা. নজরুল ইসলাম তাকে দেখেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি ঢাকা শিশু হাসপাতালের নবজাতক শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মাহফুজা শিরীনের অধীনে শিশুটিকে ভর্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ভর্তির পর পরীক্ষায় শিশুটির শরীরে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও CRP, Ferritin, Procalcitonin, SGPT ও SGOT-এর রিপোর্ট ডেঙ্গু এক্সটেন্ডেড সিনড্রোমের সঙ্গে ক্লিনিক্যালি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল বলে দাবি করেছে তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়, ১ অক্টোবর সন্ধ্যার পর শিশুটির ভাইটালস ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। অধ্যাপক ডা. মাহফুজা শিরীন শিশুটিকে দেখে ক্লোজ মনিটরিংয়ের জন্য পিআইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। তবে শিশুটির মা তখন পিআইসিইউতে নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে ওয়ার্ডেই চিকিৎসার কথা বলেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি।
পরদিন ২ অক্টোবর সকালে শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে ওয়ার্ডেই রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য প্লাজমাসল ফ্লুইড দেওয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১টার দিকে অধ্যাপক শিরীন আবার শিশুটিকে দেখে দ্রুত পিআইসিইউতে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। স্বজনরা রাজি হলে বিকেল ৪টার দিকে তাকে পিআইসিইউতে নেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, পিআইসিইউতে নেওয়ার পর রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ওষুধ দেওয়া হয়। এরপরও শিশুটির অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। ৩ অক্টোবর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেটর দেওয়া হয় এবং সিভি লাইন করা হয়। পরে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে সিপিআরের মাধ্যমে হৃদস্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। সব ধরনের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়ার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ওই দিন বিকেল ৫টা ২ মিনিটে শিশুটির মৃত্যু হয় বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়।
হাসপাতালের দাবি, শিশুটির চিকিৎসাসংক্রান্ত সব প্রিন্টেড ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টের কপি ও ডেথ সার্টিফিকেট স্বজনদের দেওয়া হয়েছে।
আভানের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খণ্ডিত তথ্য প্রচার করে চিকিৎসকদের দায়ী করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছে তারা।
প্রতিনিধি/এআর




