জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ-ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশের ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এভাবে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ওষুধের দাম বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপি) মহাসচিব হালিমুজ্জামান।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাপি কার্যালয়ে মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের 'ঔষুধ শিল্পের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা' শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
হালিমুজ্জামান বলেন, ওষুধ শিল্পে এনার্জি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও ডিজেল, এই দুই জায়গাতেই শিল্পটি সমস্যায় পড়ছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্কিং আওয়ারের সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে অন্য শিল্প কারখানার পার্থক্য হলো, আমরা একটা অপারেশন শুরু করলে এটাকে বন্ধ করা যায় না। সুতরাং কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে আমাদের সম্পূর্ণ জিনিসটা নষ্ট হয়ে যাবে। এ কারণে আমাদের ব্যাকআপ হিসেবে জেনারেটর, বড় বড় ইউপিএস—চালাতে হয়।
বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরোপুরি জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু গ্যাস না থাকায় জেনারেটর চালাতেও ডিজেলের প্রয়োজন হচ্ছে বলে জানান বাপি মহাসচিব। তিনি বলেন, যেহেতু গ্যাস নাই, এটা ডিজেল ফুয়েলের ওপর নির্ভর করছে। ডিজেল ফুয়েলের যে ট্যাংকার কিংবা স্টোরেজ ক্যাপাসিটি আছে, এটা আমরা কখনোই বড় করে করিনি। এখন আমরা এমন হয়ে গেছে যে, যেই ট্যাংকটা আছে, ওই ট্যাংকটা ফুরিয়ে আমরা আটকে যাচ্ছি। কন্টিনিউয়াসলি আমাদেরকে ওই ডিজেল আনতে হচ্ছে। গাড়ি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকছে, তারপর ওখান থেকে আমরা আবার ট্যাংকি দিয়ে চালাচ্ছি।
জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় কতটা বেড়েছে, তার উদাহরণও দেন বাপি মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘১৫ টাকা ছিল বিদ্যুতের সরকারি রেটে, আমার ফ্যাক্টরির হিসাবে আসছে এখন ৪২ টাকা। ১৫ টাকার জায়গায় ৪২ টাকা হচ্ছে।’
শুধু জ্বালানি নয়, ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক খাতে ব্যয় বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটা ওষুধের দাম অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এনার্জি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এনার্জির বাইরেও টেস্টিংসহ আরও অনেক খাত আছে।
ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার পরিধি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে হালিমুজ্জামান বলেন, ২০ বছর আগের জিএসপিতে পাঁচটা টেস্ট ছিল। এখন ওটা আটটা হয়েছে। আগে ইমপিউরিটি কী জিনিস, সেটা আমরা জানতাম না। এখন এমন প্রোডাক্ট আছে যার ১৮-২০টা ইমপিউরিটি আছে।
তিনি বলেন, এসব ইমপিউরিটি পরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ডের খরচও অনেক বেশি। ১৮-২০টা ইমপিউরিটি টেস্ট কীভাবে করব? আর ইমপিউরিটি যে টেস্ট করব, কোন স্ট্যান্ডার্ডে, কোনটার রেসপেক্টে এগুলো রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ড করতে হয়; এগুলো অনেক ব্যয়বহুল।
ওষুধ উৎপাদনের পর দীর্ঘ সময় ধরে নমুনা সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করার কারণেও খরচ বাড়ছে বলে জানান তিনি। হালিমুজ্জামান বলেন, আমি একটা প্রোডাক্ট আজকে বানাচ্ছি। এই প্রোডাক্টটা আমাকে রেখে দিতে হবে শেলফ লাইফের জন্য। বাজারে হয়তো এই পণ্যের বাজার হয়তো দুই বছর আগেই পড়ে গেছে, কিন্তু আমাকে আমার কাছে থাকতে হবে। এক্সপায়ার করার পরেও আরও এক বছর রাখতে হবে। এগুলো আমার নিয়মিত টেস্ট করতে হয়। এই টেস্ট করার জন্য খরচের কিন্তু হার অনেক।
জ্বালানি ব্যয় বর্তমানে চোখে পড়লেও ওষুধ উৎপাদনের অন্যান্য ব্যয়ও বাড়ছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, এনার্জি ওয়ান অব দেম, যেটা আমরা চোখে দেখতেছি। আর বাকি যেগুলো আছে, সেটা আমরা এখন কারেন্টলি চোখে দেখছি না এবং আমরা বুঝতেছি না যে ওর কস্ট আসলে কত।
গবেষণা ও উন্নয়ন বা আরঅ্যান্ডডি খাতেও ব্যয় বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদন করতে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণে জ্বালানি, কাঁচামাল, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গবেষণা ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত হচ্ছে বলে জানান বাপি মহাসচিব।
তিনি বলেন, এই সবগুলিই আসলে ওষুধের উৎপাদন খরচ। তবে তা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর মাঝে জ্বালানির খরচও যদি এরকম বাড়তেই থাকে, তাহলে তা অবশ্যই আমাদের মুনাফার উপর প্রভাব ফেলবে।
হালিমুজ্জামানের বলেন, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় প্রথমে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় চাপ তৈরি করলেও এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ওষুধের দামেও পড়তে পারে। অর্থাৎ জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না এলে উৎপাদন খরচ সামাল দিতে ভবিষ্যতে ওষুধের দাম বাড়ানো ছাড়া শিল্পের সামনে আর কোনো পথ নাও থাকতে পারে।
এমএইচ/এএস




