রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে (নিনস) যুক্ত হচ্ছে আরও ৫০০ শয্যা। নতুন ভবনটির উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে হাসপাতালটির মোট শয্যাসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজারে। শনিবার (১৫ আগস্ট) সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভবনটির উদ্বোধন করবেন বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এতে দেশে স্ট্রোক, মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের আঘাতসহ বিভিন্ন জটিল স্নায়ুরোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ আরও বাড়বে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ভবনটির নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। অধিকাংশ চিকিৎসা সরঞ্জামও স্থাপন করা হয়েছে।
হাসপাতালের নতুন ভবনটি তিনটি বেজমেন্টসহ মোট ১৫ তলা। নিচের তিনটি তলায় পার্কিং ও বিভিন্ন সার্ভিস কার্যক্রমের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ওপরের ১২ তলায় রয়েছে রোগীদের ওয়ার্ড, কেবিন, অস্ত্রোপচার কক্ষ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সুবিধা।
নতুন ভবনে থাকছে ৪০টি আইসিইউ শয্যা, ২০টি এইচডিইউ শয্যা, ২৪টি পোস্ট-অপারেটিভ শয্যা এবং ১১২টি কেবিন। এ ছাড়া ভবনটিতে ১০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত ট্রমা ইউনিট করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা, ওপর থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা অন্যান্য দুর্ঘটনায় মাথা ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীদের চিকিৎসায় এই ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ট্রমা ইউনিটে ২৪ ঘণ্টা অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা থাকবে। এখানে চারটি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে, যার দুটি মডুলার অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, জার্মান প্রযুক্তিতে নির্মিত এসব আধুনিক অপারেশন থিয়েটারে নিয়ন্ত্রিত ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে অস্ত্রোপচার করা যাবে, ফলে অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণের ঝুঁকি কমবে।
নতুন ভবনটির আরেকটি বিশেষত্ব হলো পুরো ভবনটি সেন্ট্রাল এসি ব্যবস্থার আওতায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি হাসপাতালের মধ্যে এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা এই প্রথম যুক্ত হচ্ছে।
গুরুতর অসুস্থ ও মাথা কিংবা মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া রোগীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে। সেই ঝুঁকি কমাতে নতুন ভবনে রোগী স্থানান্তরের বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এক থেকে তিনতলা পর্যন্ত রয়েছে চলন্ত সিঁড়ি বা এসকেলেটর। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালে এ ধরনের সুবিধাও প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন ভবনে চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। রয়েছে একটি ক্যাথল্যাব, দুটি এমআরআই এবং দুটি সিটি স্ক্যান মেশিন। পাশাপাশি ৬২টি ভেন্টিলেটরের সুবিধা থাকবে।
চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করার জন্য অত্যাধুনিক অটোক্লেভ মেশিন, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সলিড ওয়েস্ট ডিসপোজাল সিস্টেম এবং পৃথক অক্সিজেন প্ল্যান্টও স্থাপন করা হয়েছে।
হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা নিতে আসেন স্ট্রোকের রোগীরা। এর পরেই রয়েছে দুর্ঘটনায় মাথা ও মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া রোগী। এ ছাড়া পার্কিনসনস, ডিমেনশিয়া, গিলিয়ান-বারে সিনড্রোম (জিবিএস), মৃগী, হাইড্রোকেফালাসসহ নানা ধরনের নিউরোলজিক্যাল রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয় এখানে। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক সব বয়সী রোগীর জন্যই চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান খান বলেন, নতুন ভবন চালু হলে হাসপাতালে আরও ৫০০ শয্যা যুক্ত হবে। বর্তমানে শয্যাসংকটের কারণে অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দিতে হয়। শয্যার বাইরে রোগী ভর্তি না করার নীতির কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। নতুন ভবন চালু হলে আরও বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিউরোরোগীদের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
নতুন ভবনটির উদ্বোধন প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনে তার ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন ভবনটির উদ্বোধন করবেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন ৫০০ শয্যার ভবনটি চালু হলে দেশের বিশেষায়িত স্নায়ুরোগ চিকিৎসায় নিনসের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে স্ট্রোক ও দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার ও নিবিড় পরিচর্যার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি রোগী ফেরত দেয়ার বর্তমান চাপও কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসএইচ/এআরএম




