রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ: ২৬ বছরের কর্মচঞ্চল এলাকা এখন নীরব-নিস্তব্ধ

মাহফুজ উল্লাহ হিমু
প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০২৬, ১১:০৫ এএম

শেয়ার করুন:

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ: ২৬ বছরের কর্মচঞ্চল এলাকা এখন নিস্তব্ধ
কোলাজ: ঢাকা মেইল।

রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতাল এলাকা দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ছিল প্রাণবন্ত। হাসপাতাল সংলগ্ন মাত্র পাঁচ-ছয় ফুট প্রশস্ত গলির ৫০ গজজুড়ে দিনরাত থাকতো মানুষের ভিড় আর দোকানিদের ব্যস্ততা। হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট গলিতে ভাতের হোটেল, ফার্মেসি, ফাস্টফুড ও ভাসমান দোকান মিলিয়ে ছিল এক কর্মচঞ্চল পরিবেশ। কিন্তু সেই চেনা চিত্র এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সরকারি নির্দেশে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ হওয়ার পর পুরো এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে নীরবতা। যে গলিতে একসময় পা ফেলার মতো জায়গা থাকতো না, সেখানে এখন দোকানপাট ফাঁকা, ক্রেতাশূন্য রাস্তায় থমকে আছে প্রায় ২৬ বছরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। শুধু ওই গলিটিই নয়, হাসপাতালের আশপাশ এলাকায় নেমে এসেছে নীরবতা। মানুষের কোলাহল, অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ আর স্বজনদের ভিড় না থাকায় এখন হাসপাতাল এলাকাটিতে যেন কবরের নীরবতা নেমে এসেছে।

ad-din-1হাসপাতালটির দ্বিতীয় তলায় রয়েছে একটি মসজিদ, যা রোগীর স্বজনদের জন্য ছিল এক ধরনের ‘আশ্রয়স্থল’। রোগীদের অনেক স্বজন দিন-রাত এখানেই অবস্থান করতেন। কেউ নামাজ আদায় করতেন, কেউ মেঝেতে শুয়ে বিশ্রাম নিতেন। ২৪ ঘণ্টাই সেখানে মানুষের উপস্থিতি থাকত।

তবে হাসপাতাল বন্ধ হওয়ার পর বদলে গেছে সেই চিত্র। একসময় রোগীর স্বজনদের ভিড়ে মুখর থাকা মসজিদটি এখন প্রায় ফাঁকা। জামাতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও তেমনটা নেই। সেখানেও এখন নেমে এসেছে নীরবতা।

হাসপাতালের উত্তর-পশ্চিম দিকে মাত্র ৫০ গজের এই গলিতে ছিল তিনটি ভাতের হোটেল, দুটি ফাস্টফুড দোকান, তিনটি ফার্মেসি, সেদ্ধ ডিমের স্টল এবং একাধিক ভাসমান ফলের দোকান। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে চলত ব্যস্ততা। বিশেষ করে ফার্মেসি ও খাবারের দোকানগুলোতে ক্রেতার ভিড় থাকত সারাক্ষণ। পুরো মগবাজার ঘুমিয়ে পড়লেও গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের আনাগোনায় জমজমাট থাকতো ছোট্ট এই গলিটি।

ad-din-9প্রায় ২৬ বছর ধরে এভাবেই চলছিল এখানকার জীবনযাত্রা। কিন্তু হাসপাতালের বন্ধ হওয়ার পর থেকে সেই চেনা দৃশ্য নেই। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ১১ জুন সরকারি নির্দেশে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ হওয়ার পর পুরো এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে স্থবিরতা। একসময় মানুষের পদচারণায় মুখর গলিটি এখন প্রায় জনশূন্য। উধাও হয়ে গেছেন ভ্রাম্যমাণ ফল ও ডিম বিক্রেতারা, ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে ভাতের হোটেল থেকে শুরু করে ফার্মেসিগুলোও।

সোমবার (২২ জুন) দুপুরে গলির অপূর্ব হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি টেবিল ফাঁকা পড়ে আছে। মাত্র দুটি টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছেন ক্রেতারা। অথচ হাসপাতাল বন্ধের আগে একই সময় টেবিল খালি হওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো ক্রেতাদের। হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ব্যবসায়। কাজের চাপ কমে যাওয়ায় দিনের বড় একটি সময় অলসভাবেই কাটছে হোটেলটির কর্মচারীদের।

হোটেলের মালিক খাইরুল মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে কোনো কাস্টমার নেই। আইটেমের পরিমাণ কমিয়েছি, তাও খাবার থেকে যায়। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।’

ad-din-6একই অবস্থা পাশের বিহীম ফার্মেসির। ফার্মেসির বিক্রেতা রাজু মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের ৯৫ শতাংশ কাস্টমারই আদ্-দ্বীন হাসপাতালের। বাকি ৫ শতাংশও আশপাশে থাকা হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স, মেডিকেলের ছাত্রী ও কর্মচারীরা। হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় রোগী নেই। বাকি ৫ শতাংশ দিয়ে ব্যবসা তো দূরের কথা কর্মচারীদের বেতনও দিতে পারব না।’

শুধু এই গলিই নয়, হাসপাতাল বন্ধে আশপাশের পুরো মগবাজার এলাকাতেই এর প্রভাব পড়েছে। আবাসিক হোটেল, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ছোট দোকান-সবখানেই বিক্রি কমে গেছে।

২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বর্তমানে মোট শয্যা সংখ্যা ৭০০টি, যার মধ্যে ১৮০টি বিনামূল্যের বেড। শিশু ওয়ার্ডে ৬৬টি বিনামূল্যের বেড রয়েছে, যেখানে মায়ের খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে। অপুষ্টিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য রয়েছে ১৫টি বিশেষ ফ্রি বেড। এছাড়া হাসপাতালটিতে ১০১ শয্যার এনআইসিইউ রয়েছে। ৭০০ বেডের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৯০টি বেডে রোগী ভর্তি থাকে। প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। হাসপাতালটিতে মোট কর্মী ১ হাজার ৯৭০ জন, যার মধ্যে ১ হাজার ৪৮০ জন নারী কর্মী।

ad-din-7ফলে আদ-দ্বীন হাসপাতালকে কেন্দ্র করে ভর্তি ও বহির্বিভাগের রোগী, রোগীর স্বজন মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মানুষের সমাগম হয়। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পরে মগবাজারের এলাকার অর্থনীতিতে। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল বন্ধের পর বিপাকে পড়েছেন হাসপাতালকেন্দ্রীক মগবাজার মোড় ও এর আশপাশের ব্যবসায়ীরা।

প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। খাবার হোটেল ও ফার্মেসির মতো হাসপাতাল বন্ধের প্রভাব পড়েছে মগবাজারের আবাসিক হোটেল ব্যবসাতেও। স্বল্পমূল্যে সেবা দেওয়ায় বেসরকারি হাসপাতলটি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের আস্থার হাসপাতাল হয়ে উঠেছিল, অনেকেই হাসপাতালটিকে ‘গরিবের হাসপাতাল’ বলেও আখ্যা দিতেন।

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মগবাজারে ঢাকার বাইরে থেকে আসা মানুষের জন্য অসংখ্য আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে। এসব হোটেলের অন্যতম অতিথি ছিল দূর-দূরান্ত থেকে আদ-দ্বীন হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা। ফলে হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে হোটেল ব্যবসাতেও।

ad-din-8আদ-দ্বীন হাসপাতালের পাশের সুইট স্লিপ হোটেলের ম্যানেজার সাজ্জাদুল ইসলাম রাজ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা চলে ঢাকার বাইরে থেকে আসা মানুষদের টার্গেট করে। তারা দুই-এক দিনের জন্য ঢাকায় আসেন। আত্মীয়-স্বজনের বাসা না থাকায় হোটেলে উঠেন। এক্ষেত্রে বিদেশগামী ও রোগীর স্বজনরা থাকেন সবচেয়ে বেশি। আমাদের হোটেল আদ-দ্বীনের পাশে হওয়ায় প্রতিদিনই হাসপাতালের বর্ডার থাকতো। এটা আমাদের একটা নির্ভরশীলতাও ছিল। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় রোগীর স্বজন নেই।’ এভাবে চললে ব্যবসা টিকানো মুশকিল হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একই চিত্র আশপাশের অন্য হোটেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও। মগবাজারের বাটার গলির ভাই ভাই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের দোকানি শামীম হোসেন বলেন, ‘আমাদের বড় কাস্টমার সব ডাক্তার বা মেডিকেল শিক্ষার্থী। হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় অনেকে সাময়িক সময়ের জন্য এলাকা ছেড়েছে। ফলে হুট করেই বেচাকেনায় ধ্বস নেমেছে।’

জনতা স্টোরের দোকানি জামান মিয়া বলেন, ‘আমার দোকানের বেশিরভাগ কাস্টমার মেডিকেলের ছাত্রী। বিশেষ করে কাশ্মিরি শিক্ষার্থী। হাসপাতাল বন্ধ হওয়ার পর তারা সবাই এখানে থাকা ও মেডিকেল কলেজের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে।’

ad-din-5মগবাজার ওয়ারলেসের পাশের একটি গলির নাম ডাক্তার গলি। আদ-দ্বীন ও কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ থাকেন এই গলিতে। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়েছে গলিটির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও। 

ডাক্তার গলির মুখে অবস্থিত সিপি ফাইভ স্টারের বিক্রেতা মো. মিথুন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে বেচাকেনা কমেছে। অনেকে ডাক্তার হাসপাতাল বন্ধের পর ফ্যামিলি নিয়ে বাড়ি গেছে, অনেকে অন্য শাখায় কাজ করছে। এজন্য কাস্টমার কম।’

ছোট ছোট এসব ব্যবসায়ীর মতো হাসপাতাল বন্ধের মন্দাভাব পড়েছে আগোরা ও স্বপ্নের মতো বড় সুপার মার্কেট চেইনেও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আগোরার এক কর্মী বলেন, ‘আমাদের বড় ক্রেতা চিকিৎসক, মেডিকেলের শিক্ষার্থী ও রোগীর স্বজনরা। হঠাৎ হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় অনেকেই আদ-দ্বীনের অন্য হাসপাতালে কাজ করছে। অনেকেই ফ্যামিলি নিয়ে ছুটিতে আছে। এতে আমাদের ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে।’ একই চিত্র সদ্য চালু হওয়া স্বপ্নের মগবাজার ব্রাঞ্চেও।

হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা

হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু রয়েছে। রোগীদের আদ্-দ্বীন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে বিনামূল্যে। ব্যানার টানিয়ে লেখা রয়েছে, চলমান সেবার স্বার্থে এই হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স দ্বারা আদ্-দ্বীন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জুরাইন, পোস্তগোলা নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।’

ad-din-4হাসপাতালের দায়িত্বরতরা জানান, এখনো অনেক রোগী দূর-দূরান্ত থেকে আদ-দ্বীন হাসপাতালে আসছেন। আমরা তাদের অন্য শাখায় পাঠাচ্ছি।

কর্মরতদের বিষয়ে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানবসম্পদ ও গণসংযোগ বিভাগের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একটা অংশ এখনো হাসপাতালে আছে। অনেকেই ছুটিতে আছেন। তারা স্বাভাবিকভাবে কাজে ফেরার প্রত্যাশা করছেন।’

ad-din-2

আপিলের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো আপিল করিনি। আপিলের যে প্রক্রিয়া আছে আমরা তা অনুসরণ করব।’

এমএইচ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর