দেশে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশের বেশি ঘটছে। এসব রোগে প্রায় ৫১ শতাংশ মৃত্যু অকালমৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী এক থেকে তিন মাসের মধ্যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিজ নিজ খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। এসব পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন, তদারকি, পরিমাপযোগ্য সূচক এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সোমবার (২২ জুন) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী সভা সঞ্চালনা করেন। যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিবেরা এতে অংশ নেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সভায় কারিগরি সহযোগিতা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ।
সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ ক্ষেত্রে গতানুগতিক চিন্তার বাইরে গিয়ে উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ এবং সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি।
তিনি আরও বলেন, জনসাধারণকে যদি বোঝানো যায় যে ওষুধ বা চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় জানানো হয়, অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার ক্রমাগতভাবে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসারসহ দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অংশগ্রহণে একটি যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৯ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
সভায় বলা হয়, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ‘সব নীতিতে স্বাস্থ্য’ নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিতভাবে জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা, সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করা।
সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব, জ্যেষ্ঠ সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকরা নিজ নিজ খাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়ন বিষয়ে মতামত ও সুপারিশ দেন। তারা সমন্বিত উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ সময় ডা. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ বলেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে একজন করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে মনোনয়ন দিতে হবে। এসব কর্মকর্তার জন্য অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বিশেষ ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির আয়োজন করা হবে।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, বিভিন্ন খাতকে একত্র করে সমন্বিতভাবে কাজ না করলে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাতকেও কার্যকরভাবে যুক্ত করা জরুরি।
সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, এই সমন্বিত কাঠামো বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত ও পরিমাপযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী এক থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
এসএইচ/এআর




