বায়ুবাহিত রোগ হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে গত দুই মাসে দেশে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে হামের চিকিৎসায় দায়িত্বরত চিকিৎসক, নার্স ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের আসন্ন ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
কিন্তু হাম পরিস্থিতি কেন এত খারাপ হলো, নেপথ্যে কী- সেই কারণ খুঁজতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচওকে একটি ‘স্বাধীন তদন্ত’ করার জন্য অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে সরকার।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে বৈশ্বিক এই সংস্থাটির কাছ থেকে ইতিবাচক জবাব পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
তিনি বলেন, ‘আমরা কাউকে ঢালাও দোষারোপ করতে চাই না বা কাউকে এককভাবে দায়ও নিতে চাই না। তবে ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য হাম পরিস্থিতি কেন এমন হলো সেটা জানা দরকার। সেজন্যই একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনকোয়ারির জন্য ডব্লিওএইচওকে আমরা অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছি। তারাও আগ্রহ দেখিয়েছে।’
যদিও এর আগে ইউনিসেফ ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিল, হাম পরিস্থিতি নিয়ে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা অন্তত পাঁচটি চিঠি দিয়েছিল এবং এছাড়া বিভিন্ন বৈঠকে অন্তত ১০ বার সতর্ক করা হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান দেশের সংবাদ মাধ্যমের কাছে তার প্রতিক্রিয়ায় ইউনিসেফের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যদিও হামের টিকার স্বল্পতা মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি- এমন অভিযোগ করে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করছেন। হাম উপসর্গে শত শত শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শাস্তি দাবি করে ঢাকায় নানা কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন।
বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্তও। সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে কেন কমিশন গঠনের নির্দেশ দেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

তবে সম্প্রতি স্বাস্থ্য সচিব ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, টিকার সংকট এবং হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে সরকার। কেন এত শিশুর মৃত্যু হলো বা এক্ষেত্রে কারও কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমদ বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দোদুল্যমানতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বই এই পরিস্থিতির জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী; কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে মহামারি শুরু হওয়ার পরে এটাকে হালকাভাবে নেওয়ার কারণেই অনেক মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়নি।
এদিকে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলও হামের এই ভয়ানক পরিস্থিতির জন্য বরাবরই বিগত সরকারের টিকা সংগ্রহ ও টিকাদানে ব্যর্থতাকেই দায়ী করে আসছেন।
শনিবার (২৩ মে) তিনি সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আগের সরকারের গাফিলতির কারণেই সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। কিন্তু এ ঘটনায় যারা দোষী, এখন তাদের বিচারের ব্যবস্থা করার চেয়ে এই মুহূর্তে হামে আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়াই সরকারের কাছে বেশি জরুরি।’
এ নিয়ে হাইকোর্টে যে রিট হয়েছে, সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, ‘ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থা বাদ দিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করায় দেশে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়।’

অর্থাৎ টিকা পরিস্থিতি নিয়ে যারা অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করছেন, তাদের মূল বক্তব্য হলো- ওই সময় টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন করার কারণে সময়মতো টিকা সংগ্রহ করা যায়নি এবং সে কারণেই জাতীয়ভাবে টিকার ঘাটতি হয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণত শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। এছাড়া প্রতি চার বছর অন্তর দেশব্যাপী বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো হয়, যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই ক্যাম্পেইন হয়নি বলে জাতীয় সংসদে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
ওই সময়ের প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. সায়েদুর রহমান অবশ্য গত ১ মে ফেসবুকে ব্যাখ্যা দেন। সেখানে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সব টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমেই সংগ্রহ করা হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এর মূল্য পরে পরিশোধ করা হয়েছে। তার দাবি, ২০২৫ সালে টিকা না পেয়ে মানুষের ফিরে যাওয়ার ঘটনাও জানা যায় না।
যদিও ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার উন্মুক্ত টেন্ডারে টিকা কেনার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেই কারণেই বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্রয় প্রক্রিয়ায় দেরি হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কাজ করেছেন এমন একজন কর্মকর্তা বলছেন, তখন সরকার প্রথমে টিকা কেনার জন্য ইউনিসেফের সঙ্গেই যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পরিকল্পনা কমিশন উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার পরামর্শ দিলে উপদেষ্টা পরিষদ তা অনুমোদন করে।
এরপর সরকারের দিক থেকে টিকা কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও ক্রয় সংক্রান্ত কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ার কারণেই মূলত পরে পর্যাপ্ত টিকা আসা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এত মৃত্যুর দায় কার?
হাম পরিস্থিতির অবনতির জন্য ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে আঙুল তুললেও ওই সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, সেই সময় প্রয়োজনীয় টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তখন টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়নি।
ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলছেন, বৈশ্বিকভাবেই হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে এবং বাংলাদেশে হামের যে পরিস্থিতি, তার জন্য কাউকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, ‘এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের বয়স পাঁচ বছরের কম। করোনা মহামারির জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিপর্যয়ে পড়েছিল। ২০২৪-২৫ সালে টিকাদানের বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি। তাছাড়া মায়েদের ও শিশুদের অপুষ্টিও হামের প্রাদুর্ভাবে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।’
জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘তারপরেও আমরা যাতে ভুল না করি কিংবা কোনো ভুল হয়ে থাকলে তার যেনে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য হাম পরিস্থিতি এই পর্যায়ে আসার কারণ খুঁজে বের করতে আমরা ডব্লিওএইচওকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনকোয়ারি করতে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিয়েছি। তারাও আগ্রহ দেখিয়েছে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও ইতোমধ্যেই সতর্ক করে বলেছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেটের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে।
আবার এপ্রিলের শেষ দিকে একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করে ডব্লিউএইচও। হামের চলমান পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলেও মূল্যায়ন করে সংস্থাটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারির সময়ে সারাবিশ্বেই শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে টিকাবিরোধী প্রচারণাও বেড়েছে, যা হাম সংক্রমণ ফিরে আসার পথ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশেও একটি গোষ্ঠী টিকার বিরুদ্ধে ধর্মীয় সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে থাকে বলে অভিযোগ আছে। আবার করোনা মহামারির সময়ে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সি শিশুদের হাসপাতালে বা চিকিৎসা কেন্দ্রে নেননি অনেকে। এরপর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতার সময়ে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাঘাত হওয়ায় অনেকে সময়মতো টিকা নিতে পারেনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমদ বলছেন, হাম হচ্ছে শিশুদের প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায়, আর এই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি সময়মতো টিকা না দেওয়ায়। আবার টিকা সময়মতো আসেনি অন্তর্র্বতী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে।
তিনি বলেন, ‘এই যুগে পাঁচ শতাধিক বাচ্চার এভাবে মৃত্যু অকল্পনীয়। শুরুতেই এর ব্যাপকতা অনুধাবন করে মহামারি ঘোষণা করে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিলে এত মৃত্যু হয়তো আমাদের দেখতে হতো না। মৃত্যু কমিয়ে আনার জন্য শুরুতেই কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা ও জাতীয় নির্দেশিকা তৈরি করা উচিত ছিল।’
বেনজির আহমদ বলেন, ‘প্রতিটি মৃত্যু শুরু থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্বারা অডিট করলে পরবর্তীতে মৃত্যু ঠেকাতে করণীয় খুঁজে পেতে সহায়ক হত। এগুলো কিছুই হয়নি। মনোযোগ দিয়ে নিবিড়ভাবে লড়াই করলে এত মৃত্যু হতো না। সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএইচ




