থাইরয়েড সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গর্ভাবস্থায় ও প্রসবোত্তর সময়ে থাইরয়েড রোগ ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক চিকিৎসা নির্দেশিকার (গাইডলাইন) প্রকাশ ও শুভ উদ্বোধন করেছে থাইরয়েড টাস্কফোর্স ও বাংলাদেশ অ্যান্ডোক্রাইন সোসাইটি।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) জনসংযোগ বিভাগ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এর আগে বুধবার (২০ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে এই গাইডলাইনের উদ্বোধন করা হয়। বিশ্ব থাইরয়েড দিবসকে সামনে রেখে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যকর্মীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘থাইরয়েড স্বাস্থ্য রক্ষায় সঠিক পুষ্টি’।
বিজ্ঞাপন
এ সকল আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউ’র উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। তিনি তার বক্তব্যে গর্ভাবস্থায় ও প্রসবোত্তর সময়ে থাইরয়েড রোগ ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক চিকিৎসা নির্দেশিকা (গাইডলাইন) এভিডেন্স বেইসড মেডিসিন প্র্যাকটিসে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন এবং জন্মের পর নবজাতকের থাইরয়েড পরীক্ষাসহ রোগ নির্ণয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে জানানো হয়, এই নতুন গাইডলাইনটি গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের জটিলতা নিরসনে, অকাল প্রসব, গর্ভপাত, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমানো এবং সুস্থ সন্তান জন্মদানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন আয়োজক চিকিৎসকরা। বিশেষ করে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের চিকিৎসকদের জন্য এটি একটি হাতে-কলমে দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অ্যান্ডোক্রাইন সোসাইটির (বিইএস) সভাপতি ডা. ফারিয়া আফসানা। বিশেষ অতিথি ছিলেন বারডেম এর পরিচালক (একাডেমি) অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক পাঠান। মূল বক্তা ছিলেন বিইএসের প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট ও থাইরয়েড টাস্কফোর্সের কো-অর্ডিনেটর ডা. শাহজাদা সেলিম, বাংলাদেশ অ্যান্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. এম সাইফুদ্দিন। প্যানেল অব এক্সপার্টস ছিলেন নিনমাস এর পরিচালক ও বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী, বিএমইউ’র অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম এ হাসনাত, জেড এইচ সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. শেখ জিনাত আরা নাসরীন, কন্টিনেন্টাল হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মো. হাফিজুর রহমান। সঞ্চালক ছিলেন থাইরয়েড টাস্কফোর্স ও বিইএস’র সদস্য সচিব ডা. সৈয়দ আজমল মাহমুদ।
নিনমাসের পরিচালক ও বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী বলেন, থাইরয়েড ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী গ্রন্থিটি মানব শরীরের সামগ্রিক সুস্থতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে চারটি সময়ে জন্মের পর-পরই, বয়ঃসন্ধিকালে, মায়েদের গর্ভধারণের পূর্বে এবং বয়স ৫০ হওয়ার পর-পরই অবশ্যই থাইরয়েড স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, থাইরয়েড চিকিৎসায় নতুন পদ্ধতি রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ও মাইক্রোওয়েভ এর মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা যায়। এক্ষেত্রে কোন কাঁটাছেড়া ছাড়া শুধু সুইয়ের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা যায়; তাতে রোগীকে অজ্ঞান করার প্রয়োজন পড়ে না, কিংবা রোগীকে হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন পড়ে না এবং এই পদ্ধতির কোনো বড় ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই, খরচও কম হবে । টিউমার অ্যাবলেশনের পদ্ধতি দেশের মানুষের থাইরয়েড সমস্যা ও লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসায় অবদান রাখবে।
সেমিনারে বলা হয়, গলার নিচের অংশে শ্বাসনালীর সামনে অবস্থিত প্রজাপতির আকৃতির একটি ছোট গ্রন্থি হলো থাইরয়েড। এটি প্রধানত দুটি হরমোন নিঃসরণ করে: থাইরক্সিন এফটি৪ এবং ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন এফটি৩। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া (মেটাবলিজম), হৃদস্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রা এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। হাইপোথাইরয়েডিজম: গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি করলে ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, অবসাদ, কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। হাইপারথাইরয়েডিজম: বেশি হরমোন তৈরি করলে ধড়ফড়, ওজন কমা, হাত কাঁপা, অতিরিক্ত ঘাম হয়।
থাইরয়েড গ্রন্থিকে একটি ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যার সঠিক জ্বালানি হলো পুষ্টি। নির্দিষ্ট কিছু খনিজ ও ভিটামিন ছাড়া থাইরয়েড হরমোন তৈরি অসম্ভব। যে উপাদানগুলো জরুরি তা হলো আয়োডিন যেমন আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম, সেলেনিয়াম যেমন: ব্রাজিল নাট, টুনা মাছ, মুরগির মাংস, সূর্যমুখীর বীজ। জিঙ্ক যেমন গরুর মাংস, কুমড়ার বীজ, ছোলা, ডাল। আয়রন ও ভিটামিন ডি। আয়রনের অভাবে থাইরয়েড এনজাইমের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। থাইরয়েড রোগীদের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর অভাব প্রকট থাকে।
গয়ট্রোজেনিক খাবার নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যেমন: বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি ও সয়াবিনে গয়ট্রোজেন থাকে যা আয়োডিন শোষণে বাধা দেয়। তবে রান্না করলে এসব খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। থাইরয়েড রোগীরা পরিমিত পরিমাণে রান্না করা এসব সবজি খেতে পারেন। যা এড়িয়ে চলবেন তা হলো ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার (সাদা ময়দা, চিনিযুক্ত পানীয়)। জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম, নিয়মিত হাঁটা, যোগব্যায়াম বা মৃদু ব্যায়াম ইত্যাদি করা প্রয়োজন।
সেমিনারে সংশ্লিষ্ট সকল চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে থাইরয়েড রোগ নিয়ে আরও গবেষণায় উদ্যোগী হওয়ার, রোগীর সঠিক চিকিৎসা প্রদান এবং রোগ প্রতিরোধে ব্যাপকভিত্তিক কর্মযজ্ঞে লিপ্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
এসএইচ/এফএ




