স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, শুধু ভিটামিন বা সম্পূরক খাদ্য দিয়ে একটি সুস্থ জাতি গঠন সম্ভব নয়। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মায়ের দুধের ভূমিকা অনন্য এবং দীর্ঘমেয়াদি। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মায়ের দুধের বিকল্প নেই।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, একটি ভিটামিন বা এক ফাইল ওষুধ খেয়ে জীবন চলে না। কিন্তু মায়ের দুধ এমন একটি প্রাকৃতিক পুষ্টি, যা শিশুর শরীরের গঠন তৈরি করে এবং এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। জন্মের পরপরই শিশুকে শালদুধ (কলস্ট্রাম) খাওয়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান থাকে। বর্তমানে অনেক মা বুকের দুধ খাওয়াতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের দুধ এবং এরপর দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার দেওয়া উচিত। সবকিছু ওষুধ দিয়ে সম্ভব নয়। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে। পুষ্টি মানেই শুধু শরীর নয়, এটি মেধা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিরও শক্তি। পুষ্টি সপ্তাহকে শুধুমাত্র ৭ দিনের গণনা না ভেবে, পুষ্টিকর্মীদের ঘরে ঘরে গিয়ে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, টিকাদান কর্মসূচির পর দেশে হামের প্রকোপ কমেছে, তবে এখনো অনেক শিশু পুষ্টিহীনতার কারণে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। হাম আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ নিম্ন আয়ের পরিবারের এবং অপুষ্টির শিকার। শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠা, হাম প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি গঠনে মাতৃদুগ্ধের কোনো বিকল্প নেই।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. ইউনুস আলী বলেন, পুষ্টির মান অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপরেও নীতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি শিশু যদি সঠিক পুষ্টি না পায়, তবে তার মেধা মনন, কর্মদক্ষতা-কর্মক্ষমতা পূর্ণ মাত্রায় বিকশিত হয় না। যা একটি জাতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ। আমরা এখনো স্বীকার করি যে পুষ্টির সঙ্গে বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। ধনী-গরিবের মধ্যে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে পুষ্টি মাতৃত্ব বজায় রাখা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই জন্য এবার আমাদের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো পুষ্টি বৈষম্যের দিন শেষ, গড়বো স্বনির্ভর বাংলাদেশ। বিশেষ করে শিশু, কিশোরী, গর্ভবতী, ও দুগ্ধ দানকারী মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ১১টি পুষ্টি বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানো আমাদের দায়িত্ব।
বিজ্ঞাপন
সেগুলো হলো— পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন এবং প্রতিদিন খাবারে শাক সবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। খাদ্য উৎপাদন পরিবহন সংরক্ষণ রান্নায় পুষ্টিগুণ বজায় রাখুন এবং আগে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন। খাবারের চিনি ও লবণের মাত্রা সীমিত রাখুন এবং অতিরিক্ত ভাজা, তৈলাক্ত খাবার ও ফাস্টফুড বর্জন করুন। অতিপ্রক্রিয়াজাত পানীয় ও খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের শাল দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করুন এবং ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ান। ৬মাস পর মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়িতে তৈরি বাড়তি খাবার খেতে দিন। শিশুর বুদ্ধির বিকাশ এবং শারীরিক গঠনের জন্য প্রতিদিন একটি করে ডিম খেতে দিন। শিশু সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কিনা তা জানার জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান এবং ওজন-উচ্চতা সহ অন্যান্য নিয়ামকগুলো পরিমাপ করুন। কিশোর-কিশোরী সহ পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সঠিক যত্ন নিন এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করুন। নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীর চর্চার অভ্যাস গড়ে তুলুন। গর্ভবতী মায়েদের সঠিক যত্ন নিন, নিয়মিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান এবং আয়রন ও ফলিক এসিড সমৃদ্ধ বড়ি খাওয়ান।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ টি এম সাইফুল ইসলাম, ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম এ রুস্তম ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মেহেদী হাসান প্রমুখ।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, দেশে এখনো লিঙ্গ বৈষম্য, দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে পুষ্টি বৈষম্য রয়ে গেছে। শিশুর খর্বাকৃতি, অপুষ্টি এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এ বছরের জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘পুষ্টি বৈষম্যের দিন শেষ, গড়বো স্বনির্ভর বাংলাদেশ’।
এসএইচ/এফএ




