হাসপাতাল ছাড়ার পর মৃত্যু ঘটে ৪৮ ভাগ শিশুর: গবেষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২২, ০৪:০৪ পিএম
হাসপাতাল ছাড়ার পর মৃত্যু ঘটে ৪৮ ভাগ শিশুর: গবেষণা

আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুমৃত্যুর অর্ধেক ঘটনা ঘটে হাসপাতাল ছাড়ার পর। মৃত্যুবরণ করা শিশুদের শতকরা ৪৮ ভাগের মৃত্যু হাসপাতাল ছাড়ার ছয় মাসের মধ্যে হয় বলে জানিয়েছেন চাইল্ডহুড অ্যাকিউট ইলনেস অ্যান্ড নিউট্রিশন (চেইন) নেটওয়ার্কের গবেষকরা। 

শনিবার (১৬ এপ্রিল) ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর’বি) এ তথ্য জানিয়েছে। আইসিডিডিআর’বি চেইনের গবেষণাটিতে যৌথভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। 

গবেষকরা জানান, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার অল্পবয়সী শিশুদের বিভিন্ন ধরণের অসুস্থতা বা অপুষ্টিতে ভোগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকি থাকে। এ অঞ্চলের ছয়টি দেশের মোট নয়টি হাসপাতালের তিন হাজার ১০১ জনের উপর এ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করা ৩৫০টি শিশুর মধ্যে ৪৮ শতাংশের মৃত্যু হাসপাতাল থেকে ছাড় পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে ঘটেছে।

হাসপাতাল থেকে ছাড়ের ছয় মাসের মধ্যে শিশুদের একটা বড় অংশ উচ্চমাত্রার স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ছিল, যাদের মধ্যে প্রতি ৫ জনে একজনের মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে। শিশুদের হাসাপাতালে ভর্তি, ছাড়া পাওয়া, পুষ্টির অবস্থা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তাদের মৃত্যু ঝুঁকি নির্ধারণ করা, হাসপাতালে অবস্থান করা রোগীদের মতোই সহজে অনুমান করা যেতে পারে। মৃত্যুর ঝুঁকিটি অনুমানযোগ্য হলেও হাসপাতাল পরবর্তী মৃত্যুগুলো চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য সুবিধাগুলো দ্বারা উল্লেখ করা হয় না। যা বর্তমানে জাতীয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী করা উচিত। একইসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মৃত্যু ঝুঁকি বহুলাংশেই হ্রাস পায় বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

shisu

গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত্যুবরণ করা অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে বেশিরভাগই অপুষ্টিজনিত সমস্যা থেকে তৈরি হওয়া অন্যান্য শারীরিক সমস্যা, পারিবারিক অর্থ-সামাজিক অবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতায় অধিক মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর পরিবার এসব শিশুদের পর্যাপ্ত সেবা দিতে বিভিন্নভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। একাধিক পরিবারের সাথে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে, চিকিৎসা ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক সমস্যা এবং মায়েদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির দিকেও নজর দেওয়া দরকার বলে মনে করেন গবেষকরা। 

এ বিষয়ে আইসিডিডিআর’বির নির্বাহী পরিচালক ও চেইনের অন্যতম প্রধান গেবেষক ডা. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর এত সংখ্যক শিশুর মারা যাওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। এই দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু রোধ করতে চিকিৎসা পরবর্তী নির্দেশনা কাঠামোর বিষয়ে নতুন করে পর্যালোচনা এবং বাড়িতে শিশুদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত।’ 

মেকেররে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশুরোগ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ও উগান্ডার প্রধান চেইন গবেষক ডা. ইজেকিয়েল মুপেরে বলেন, ‘যখন মারাত্মকভাবে অসুস্থ একটি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয় তখন রোগীর পর্যপ্ত ইতিহাস নেওয়া হয় না। ফলে আমরা তাকে কি ধরনের চিকিৎসা দেবো এবং কবে ছাড়বো সেটা সঠিকভাবে নির্ণয় করা হয় না। এই শিশুরা দুর্বলতার দুষ্ট চক্রের মধ্যে পরে যায় এবং কখনও কখনও মৃত্যুবরণ করে। যতটা তাদের চিকিৎসায় মনোযোগ দেওয়া হয়, ততোটা তাদের অসুস্থ হওয়ার কারণ ও অনুঘটকদের উপর দেওয়া হয় না।’

এ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি অন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জর্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত হয়েছে। এতে লেখকরা শিশু মৃত্যুর হার আরও কমাতে ভর্তি ও ছাড়া পাওয়া রোগীদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি-ভিত্তিক পদ্ধতির নির্দেশিকাগুলোর একটি মৌলিক পরিবর্তনের পরামর্শ প্রদান করেন। একইসঙ্গে নিম্ন ও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে অধিক ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিকিৎসা পরবর্তী সহায়তা প্রদান করা উচিত বলে মত প্রকাশ করেন।

এমএইচ/এএস