সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ডেঙ্গু: ভয়ংকর আগস্ট শেষে উদ্বেগ সেপ্টেম্বর নিয়েও

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৮:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

ডেঙ্গু: ভয়ংকর আগস্ট শেষে উদ্বেগ সেপ্টেম্বর নিয়েও
ফাইল ছবি

চলতি বছর গত আট মাসে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ছয়শ ছুঁই ছুঁই, যা অতীতের যেকোনো সময়ের জন্য রেকর্ড। আক্রান্তের সংখ্যাও সোয়া লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি হয়েছে আগস্ট মাসে। অথচ বলা হয়েছিল, আগস্টের মাঝামাঝিতে কমে যেতে পারে ডেঙ্গুর প্রকোপ। পুরো আগস্টজুড়ে ভয়ংকর রূপ নেওয়া ডেঙ্গু সেপ্টেম্বর মাসেও অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের জুলাই মাস ছিল ভয়ংকর। তবে এটা আরও ভয়াবহ রূপ নেয় আগস্ট মাসে। এরপরে এখনো বাকি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস। এমন অবস্থায় মশানিধন কর্মসূচি সফলভাবে পরিচালনা করা না গেলে পরিস্থিতি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না তারা।

জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার গণমাধ্যমকে বলেন, সেপ্টেম্বর মাসেও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকবে। হয়ত ডেঙ্গু অনেক বেশি বাড়বে না, আবার অনেক কমে যাবে বিষয়টি এমনও নয়। সেপ্টেম্বরজুড়েই ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকবে। বর্তমান ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থেকে কিছুটা কম বেশি অথবা কাছাকাছি থাকতে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে সিটি করপোরেশনের মশা নিধন কর্মসূচিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আমাদের দেশে মশক নিধনে ফগিংকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ফগিংয়ের চেয়ে লার্ভিসাইডিংয়ের প্রতি বেশি জোর দেওয়া উচিত ছিল। এছাড়া যেভাবে ফগিং করা হচ্ছে আমাদের দেশে তাও ভুল পদ্ধতিতে। এখানে কুল (শীতল) ফগিং করা হয়, এটাও সঠিক পদ্ধতি নয়। এখানে হট (গরম) ফগিং করা হলে তা হবে বেশি কার্যকর। হট ফগিং করা হলে তাতে একটু তাপ থাকবে, এই তাপটা মশা নিধনে আরও বেশি কার্যকর। ইউরোপ-আমেরিকায় হট ফগিং করা হয়।

শুধু ঢাকায় নয়, এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সমীক্ষা অনুসারে, এ বছর দেশব্যাপী গ্রামীণ এলাকায় এডিস মশার প্রকোপ বেড়েছে তীব্রহারে। গত কয়েক মাস ধরে গ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। জরিপে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণের জন্য দায়ী ডমিনেন্ট স্ট্রেইন হলো এডিস অ্যালবোপিকটাস। ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য দায়ী ভেক্টর এডিস মশা। এ প্রজাতির মশার দুটি প্রধান স্ট্রেইন- এডিস অ্যাজিপটি ও এডিস অ্যালবোপিকটাস।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এডিস এজিপটির তুলনায় এডিস অ্যালবোপিকটাস নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি জটিল। এই জটিলতার কারণে গ্রামীণ এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এডিস অ্যালবোপিকটাস সাধারণত প্রাকৃতিক জলাধারে বেড়ে ওঠে।

সেপ্টেম্বরজুড়েও ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বেই হঠাৎ তাপদাহ বা অতিবৃষ্টি হচ্ছে। তাই সারা বছরই ডেঙ্গু থাকবে। তবে বর্ষার শুরু এবং শেষে এর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি থাকবে। তাই জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতি হয়ে উঠে ভয়ংকর।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণ উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে কমবে। গত বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি নভেম্বর-ডিসেম্বরের পর একটু কম ছিল। চলতি বছর মার্চ থেকে বাড়তে শুরু করে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন আর বর্ষা মৌসুমের আতঙ্ক নয়। ফলে এর ভয়াবহতা বাড়ছে। এটি মোকাবিলায় দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর তৎপরতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও ব্যাপকভাবে সচেতন হতে হবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, শক সিন্ড্রোমের কারণে বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। তাই অবহেলা না করে ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

গত ২০ আগস্ট ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অধিদফতরের পরিচালক (এমআইএস) অধ্যাপক ডা. মো. শাহাদাত হোসেন বলেছিলেন, যেকোনো মহামারি একটি নির্দিষ্ট সময় শুরু হয়, একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে গিয়ে শেষ হয়। তবে এ বছর ডেঙ্গুর গন্তব্য কোথায় গিয়ে থামবে তা স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশে প্রথম ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় ২০০০ সালে। এরপর থেকে প্রতিবছর বর্ষাকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। ওই সময়ে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ২০২২ সালে ডেঙ্গু নিয়ে মোট ৬২ হাজার ৩৮২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে গত বছর মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ২৮১ জন মারা গেছেন।

জেবি


আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর