রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ঢাকা

শিক্ষক সংকটে ‘ধুঁকছে’ সরকারি মেডিকেল কলেজ

মাহফুজ উল্লাহ হিমু
প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৩, ১০:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

শিক্ষক সংকটে ‘ধুঁকছে’ সরকারি মেডিকেল কলেজ
ছবি: ঢাকা মেইল

স্বাস্থ্য সেবা বা চিকিৎসা পাওয়া মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। এটি বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসক। আর চিকিৎসক তৈরির কাজ করে থাকে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। দেশের বেসরকারি কলেজে শিক্ষা ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মান নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন থাকলেও অনেকটা আস্থা ধরে রেখেছে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। বর্তমানে প্রতি বছর চার হাজার ৩৫০ জন দেশসেরা মেধাবী শিক্ষার্থী ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তবে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় এসব মেডিকেল কলেজে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। এমনকি পদায়নের পরেও কর্মস্থলে যোগদান নিশ্চিতে ব্যর্থ হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।  

মেডিকেল কলেজগুলোতে চার পদের শিক্ষক থাকেন। প্রতিটি বিভাগে সর্বোচ্চ এক বা একাধিক অধ্যাপক, এরপর সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পর্যায়ের শিক্ষকরা থাকেন। তবে এসব পদের প্রায় সবকটিতেই শিক্ষক সংকটে ভুগছে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, মাইক্রোবায়োলজির মতো মৌলিক  বিষয়গুলোতে বেশিরভাগ কলেজেই সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ের কোনো শিক্ষকও নেই। গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাধিকসংখ্যক রোগী রয়েছে এমন পাঁচটি ক্লিনিক্যাল বিষয়ে ২৫৭টি অধ্যাপক পদের মধ্যে ১৫৪টি পদেই নেই কোনো অধ্যাপক। 


বিজ্ঞাপন


রাজধানী ঢাকার ভেতরের কলেজগুলোতে প্রয়োজনীয় পদের বিপরীতে কিছু অধ্যাপক থাকলেও ঢাকার বাইরের কলেজগুলোতে অধ্যাপক যেন সোনার হরিণ। মেডিসিন বিভাগে ৯৬ পদের মধ্যে ৬৪টি পদই শূন্য। আর ঢাকার বাইরের ২২টি কলেজে নেই মেডিসিনের কোনো অধ্যাপক। 

শিক্ষক সংকটের চিত্র
চলতি বছরের এপ্রিলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস শাখার এক বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকটের একটি তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়। এতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীনে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে মেডিসিন, অর্থোপেডিক্স, গাইনি অ্যান্ড অবস, পেডিয়াট্রিক্স ও সার্জারি বিষয়ে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক পদে শিক্ষকের সংখ্যা উঠে এসেছে।


বিজ্ঞাপন


এতে দেখা যায়, মেডিসিন, অর্থোপেডিক্স, গাইনি অ্যান্ড অবস, পেডিয়াট্রিক্স ও সার্জারি বিষয়ে ২৫৭টি অধ্যাপক পদের বিপরীতে শূন্য আছে ১৫৪টি পদ। সহযোগী অধ্যাপক পদে ৩৮৫ জনের বিপরীতে শূন্য পদ ১৭১টি। তবে বিপরীত চিত্র সহকারী অধ্যাপক পদে। মোট ৫৩৭টি পদের বিপরীতে কলেজগুলোতে সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন এক হাজার ৩৭ জন। অর্থাৎ সর্বমোট পদের তুলনায় ৫০০ জন অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন পদটিতে। যাদের একটা অংশ পরবর্তী ধাপে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে সঠিক সময়ে পদোন্নতি না হওয়ায় সহকারী অধ্যাপক পদেই আটকে রয়েছেন তারা। অপরদিকে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে শিক্ষক সংকটে ভুগছে মেডিকেল কলেজগুলো। যদিও অপরাপর অনেক বিষয়ে চিত্র ভিন্ন। বিশেষ করে মৌলিক বিষয়গুলোতে সহাকারী অধ্যাপক পদেও শিক্ষক সংকট রয়েছে। 

এদিকে গত ৮ আগস্ট মেডিসিন বিভাগের ৩১ জন শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। তবে পদোন্নতির ২২ দিন পার হলেও এসব শিক্ষককে তাদের নতুন কর্মস্থলে পদায়ন করতে পারেনি স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ। এর কারণ হিসেবে রাজধানী ঢাকার মেডিকেল কলেজগুলোতে পদায়ন লাভে শিক্ষকদের ইচ্ছাকে দায়ী মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। 

এ অবস্থায় সঠিক সময়ে শিক্ষকদের পদোন্নতি, নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং সঠিক বণ্টন না করা গেলে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা খাত সংশ্লিষ্টদের। প্রশিক্ষণের এ ঘাটতি সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অতি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত হিসেবে স্বাস্থ্য শিক্ষায় পদোন্নতি ও বণ্টনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের দাবি তাদের। অপরদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নের বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ সোচ্চার রয়েছে। তবে করোনা মহামারিসহ নানা কারণে পদায়নের কাজ কিছুটা থমকে গিয়েছিল। শিগগির এই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা তাদের। 

সামগ্রিকভাবে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এমিরেটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন, এই সমস্যাগুলোর বিষয়ে আমরা দীর্ঘদিন শুনে আসছি। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের মেডিকেল কলেজগুলোতে অনেক পদ খালি। এতে মেডিকেল শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। ফলে ভালো চিকিৎসক তৈরি হবে না। এখানে যে শিক্ষকরা রয়েছেন তারা তো শুধু ছাত্র পড়ান না, রোগীও দেখেন। প্রত্যক্ষভাবে রোগীদের সেবায়ও অংশগ্রহণ করেন। ফলে সামগ্রিকভাবে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

কর্তৃপক্ষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রখ্যাত এই চিকিৎসক বলেন, এটি দেখার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ রয়েছে। তারা কেন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে না, তা বুঝে আসে না। অনেক চিকিৎসক ১০-১২ বছর আগে এমডি/এমএস পাস করে মেডিকেল অফিসার হয়ে বসে আছে। তাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না। পদোন্নতি ও শিক্ষক নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কর্তা ব্যক্তিদের এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। এর দায় প্রশাসকদের। তাদের তদারকি ও সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষক সংকট নিরসনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। 

প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রখ্যাত এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কোনোদিন সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আনিনি। উনার তো আরও কাজ রয়েছে। সব বিষয় উনার দেখতে হলে অন্যদের কাজ কী? তারা এসব প্রশাসনিক পদে রয়েছেন কেন?’ 

দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস স্বাস্থ্য অধিদফতরের
এদিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ জামাল। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, অধ্যাপক ও অন্য পদগুলোতে পদোন্নতি পরীক্ষার মাধ্যমে হয়ে থাকে। গত কয়েক বছর করোনা মহামারির কারণে অধ্যাপকসহ পদগুলোতে পদোন্নতির পরীক্ষা সঠিক সময়ে হয়নি। এ অবস্থায় সরকারি বিভিন্ন মেডিকেলগুলোতে অনেকগুলো পদ খালি রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর বাইরে এবং দূরে অবস্থিত কলেজগুলোতে। 

সংকট নিরসনে নেওয়া উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি মেডিসিনের ২৮ জনকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সার্জারিতেও ২০ জনের মতো পদোন্নতি পেয়েছেন। তারা প্রমোশন পেয়েছেন কিন্তু তাদের পোস্টিংটা হয়নি। আশা করি, তাদের পোস্টিং দেওয়া হলে এবং ঢাকার বাইরের মেডিকেলগুলোতে তাদের পদায়ন করা সম্ভব হলে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। আগে যারা ছিল তাদের বেশিরভাগকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে পোস্টিং দেওয়া হতো। রোগীর চাপ ও প্রয়োরিটি বিবেচনা করে তাদের পোস্টিংগুলো হয়েছিল। 

রাজধানীর বাইরে শিক্ষক কম থাকা প্রসঙ্গে অধ্যাপক জামাল বলেন, লোকবল কম থাকায় নতুন ও দূরবর্তী মেডিকেলগুলো হয়তো অধ্যাপক বা উচ্চ পদের শিক্ষক পাননি। এখন যারা পদোন্নতি পেয়েছে তাদের ওইসব মেডিকেলে পোস্টিংয়ের জন্য প্রাধান্য দেওয়া হবে। একইভাবে ধাপে ধাপে সব পদেই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।

এমএইচ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর