বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা সোলায়মান

রাফিউজ্জামান রাফি
প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর ২০২২, ০৪:২০ পিএম

শেয়ার করুন:

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা সোলায়মান
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার কথা সবার মনে আছে নিশ্চয়ই। যার বাঁশির সুরে বুঁদ হয়ে শহর ত্যাগ করেছিল শিশুরা।  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ সোলায়মান নামে এমনই এক বাঁশিওয়ালা আছেন। নদীর ঘাটে, ক্ষেতের আলে বসে তিনি সুর তোলেন বাঁশের বাঁশিতে। কণ্ঠে তুলে নেন মাটির গান। সেই সুর ও গান সুবাস ছড়ায় নেট দুনিয়ায়। নিজ নামে খোলা ফেসবুক পেজে তা প্রকাশ পেতেই লুফে নেন নেটিজেনরা। ফলস্বরূপ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাসরত বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে আজ আপনজনের মতো পরিচিত তার বাঁশির সুর ও গান। সম্প্রতি ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন সোলায়মান। একান্ত আলাপে উঠে এসেছে গান, বাঁশি ও প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়।

বাঁশি বাজিয়ে ও গান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এই জনপ্রিয়তাটা কীভাবে উপভোগ করেন?

ভালো লাগে। আমার বাঁশি ও গান শুনে সবাই এত প্রশংসা করবে আমি কখনও ভাবিনি। মনে হয় এত প্রশংসার আমার প্রাপ্য না। আর আমি প্রশংসার জন্যও এগুলো করি না। ভালো লাগা থেকে, মনের ক্ষুধা মেটাতেই বাঁশি বাজাই, গান করি।

solayman

বাঁশি বাজানোর শুরু কবে থেকে ছিল? 

ছোটবেলা থেকেই বাঁশি বাজাই। আমি তখন সিক্সে পড়ি। তখন থেকেই বাঁশির সঙ্গে সখ্যতা। তবে গান কিংবা বাঁশির ওপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও নেই আমার। কোনো গুরুও নেই। বলতে পারেন আমি গাইতে গাইতে গায়েন, বাজাতে বাজাতে বায়েন। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাঁশি নিয়ে যাত্রা কবে থেকে?

ফেসবুক যখন থেকে চালাই তখন নিজের আইডি থেকে বাঁশি বাজিয়ে ভিডিও করে প্রকাশ করতাম। মানুষ শুনত, কমেন্টে প্রশংসা করত। এরপর একসময় পেজ খুলে সেখানে দেওয়া শুরু করি।

পেজ নিয়ে যাত্রা শুরু কীভাবে?

পেজ আগেই খোলা ছিল। কিন্তু নিয়মিত ভিডিও দেওয়া হতো না। তিন-চার বছর আগে থেকে নিয়মিত ভিডিও দিতে থাকি। প্রথমদিকে খুব বেশি ভিউ হতো না। গত দুই বছর ধরে বেশ ছড়িয়ে গেছে। এখন গান গেয়ে বা বাঁশি বাজিয়ে প্রকাশ করলেই দেখা যায় অনেক ভিউ হয়, বেশ প্রশংসা পাই। এলিট শ্রেণি থেকে শুরু করে সকল স্তরের মানুষ প্রশংসা করেন।

solayman

সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিতি পেয়ে অনেকে সংগীতাঙ্গনে সুযোগ পেয়েছেন। আপনার ক্ষেত্রেও কি এমন সুযোগ এসেছিল?

হ্যাঁ, এসেছিল। ভিডিও দেখে আমাকে একাধিক সংগীত পরিচালক, গীতিকার ফোন করেছেন। তারা আমার কণ্ঠ ও বাঁশি বাজানোর প্রশংসা করে আমার জন্য গান করতে চেয়েছেন। কিন্তু আমি যাইনি। কারণ আমি খালি গলায় গেয়ে অভ্যস্ত। মিউজিকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাওয়াটা আমার জন্য না। আমি ওটা পারবও না। যারা ডেকেছেন তাদেরও এভাবে বুঝিয়ে না করে দিয়েছি। বলেছি, আমার গলায় রাখালের সুর পাবেন কিন্তু শিল্পীর ফ্লেভার পাবেন না। কারণ আমি জানি সংগীত ছোটখাট বিষয় না। এটি একটি লম্বা জার্নি। অনেক শেখার আছে, জানার আছে। হুট করে এখানে এসে কিছু করা যায় না।

আপনি জনপ্রিয়তা পেয়েও প্রস্তাবগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন যেটা অন্যরা হলে লুফে নিতেন। কখনও সুযোগ গ্রহণ করতে ইচ্ছা জাগেনি? 

সংগীতটা আমার কাছে অনেক বড় বিষয়। এর সঙ্গে তাল, লয় অনেককিছু জড়িত। এগুলো আমি বুঝি না, জানিও না। সবাই যে বুঝবে তাও না। কিন্তু দেখা যাবে, না জেনে না বুঝে করতে গিয়ে একটা হ য ব র ল অবস্থা হয়ে যাবে। এ কারণে আমি এর পক্ষপাতী নাই। তারপরও এক ওস্তাদের কাছে গিয়েছিলাম। উনার নাম মাহাদী। সেক্সোফোন, গিটার, ভায়োলিনের শিক্ষক। তার কাছে আমি সংগীতের বেসিকটা শিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে বললেন, দেখুন, আমি তো আপনার সঙ্গে যুক্ত আছি, আমি আপনার বাজানো ও গায়কীর ভিডিওগুলো দেখি। হয়তো আপনি তাল, লয় জানেন না। তা সত্ত্বেও আপনি যেটা পারছেন ওটা আমরাও পারছি না। আপনার বাঁশির সুরে ও কণ্ঠে যে মাধুর্য এটা খুব মানুষেরই আছে।  সৃষ্টিকর্তা এই ক্ষমতা আপনাকে ভালোবেসে দিয়েছেন। এখন আপনি যদি গানের ব্যাকরন শিখতে যান তখন আপনার এই সুরের মাধুর্য হয়তো হারিয়ে যেতে পারে। 

solayman

আপনি বললেন তাল লয় বোঝেন না। এ নিয়ে কেউ ভুল ধরে না?

হ্যাঁ, ভুল ধরে। তবে সবাই না। বিশেষ করে যারা মিউজিক জানেন তারা ধরেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ খুব নেতিবাচকভাবে প্রকাশ করেন সেটা। এটা যে শুধু ভুল ধরার জন্য তা মনে হয় না। হয়তো ঈর্ষান্বিত হয়ে কেউ কেউ ভুল ধরে থাকেন।

নেট মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের কারণে চলতে ফিরতে অনেক অপরিচিত মানুষও আপনাকে চিনে ফেলে নিশ্চয়ই? কেমন লাগে তখন?

এই বিষয়টা আমার খুব ভালো লাগে। কিছুদিন আগে আমার স্ত্রী অসুস্থ হলে আমি তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে গিয়ে আমি শুধু আমার তখনকার অবস্থা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। এরপর সবই বদলে গেল। অনেকেই আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। মুহুর্তের মধ্যেই সিটসহ হাসপাতালের সবরকম সুবিধা আমি পেয়ে গেলাম। আমার জন্য সচিবালয় থেকে ফোন দিয়েছিল। স্বাস্থ্য অদিদফতরের ডিজি সাহেব ফোন দিয়ে আমার খোঁজ নিয়েছেন। স্থানীয়দের অনেকে আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছেন। এরপর যে ক'দিন ছিলাম আমাদের বিশেষ যত্নসহকারে দেখভাল করা হয়েছে। এই ভালোবাসা আমার এই গান, বাঁশির জন্যই পেয়েছি।

solayman

গান ও বাঁশি নিয়ে আলাদা কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

না, আমার কোনো পরিকল্পনা নেই। আমি এভাবেই গেয়ে যেতে চাই। আমার ছোট একটা মেয়ে আছে। আমার খুব ইচ্ছা ছিল শিল্পী হওয়ার কিন্তু পারিনি। আমি চাই আমার মেয়েটাকে একজন পরিপূর্ণ শিল্পী করে তুলতে। ওকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিখিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী ও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

আরআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর