ভারতের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে গোয়ার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
অভিনেতার মৃত্যুর পর একে একে সামনে আসতে শুরু করেছে অজানা তথ্য। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয় জীবনে সহ-অভিনেত্রীকে যৌন হেনস্তার অভিযোগের তীরে বিদ্ধ হয়েছেন। ইমরান হাশমির ‘আশিক বানায়া আপনে’ ছবির অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত নানার বিরুদ্ধে অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় করতে বাধ্য করার অভিযোগ তুলেছিলেন। অভিযোগে তিনি আরও জানিয়েছিলেন, শুটিং সেট ছেড়ে যাওয়ার সময় তাঁর গাড়িতে হামলা করা হয়। যদিও বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নানা পাটেকর। ২০১৮ সালে মি-টু আন্দোলনের সময় অভিযোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরবর্তীতে বিচারের দাবিতে আদালতে যান তনুশ্রী। সেই সময় আদালত জানিয়ে দেয়, সময়সীমা ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা ঘটনার সত্যতা বা মিথ্যাত্ব বিচার করেনি।
শুধু অভিনেত্রীকে হেনস্তার অভিযোগই নয়, নাম জড়িয়েছে পরকীয়ায়। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের সমালোচনার পাশাপাশি বহু প্রশংসনীয় কাজ করে গেছেন। এর মধ্যে অন্যতম ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাশ্মীরের কার্গিল সীমান্তরেখায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রায় আড়াই মাস কাজ করেছিলেন। মূলত ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির মাধ্যমে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করেন নানা পাটেকর। সেই ছবিতে একজন ভারতীয় সেনা অফিসারের চরিত্রে নিখুঁতভাবে অভিনয় করার জন্য মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি সেন্টারে দীর্ঘ তিন বছর কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন তিনি।
পর্দায়ও ছিলেন অনবদ্য। অ্যাকশন দৃশ্য ছাড়াও কমেডি চরিত্রে অভিনয় দর্শকদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে। অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন। শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মাননায় ভূষিত করে।
তবে ব্যক্তিগত জীবনে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। বাবার ব্যবসায় ধস নামলে পরিবারের মুখে খাবার তোলার ভার পড়ে অভিনেতার কাঁধে। ৮ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে মুম্বইয়ের চুনাভাট্টি এলাকায় পোস্টার আঁকার কাজ করতেন। প্রতি মাসে বেতন মাত্র ৩৫ রুপি। এমনকি রাস্তার জেব্রা ক্রসিংয়ের সাদা দাগ টানার কাজ করে সংসার চালাতে হয়েছে। শত কষ্টের মধ্যেও বাবার অনুপ্রেরণায় শোবিজে ক্যারিয়ার গড়েছেন। দর্শকদের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। একটা মুম্বাই শহরে ছেড়ে গোয়ার একটি গ্রামে নিজের মায়ের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন তিনি। এর আগে পুত্র সন্তান জন্মের দুই বছরের মাথায় মৃত্যু নানাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। তার কয়েক বছর না যেতেই স্ত্রীও আলাদা হয়ে যান। যদিও স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আইনি বিচ্ছেদ হয়নি। পুত্র বিয়োগের সঙ্গে স্ত্রীকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গোয়ায় একাই বাস করতেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি একটি পুত্রসন্তান রেখে গেছেন। ছেলে নানার স্ত্রীর সঙ্গে থাকতেন।
মৃত্যুর আগে মাকে নিয়ে গোয়ায় বসবাস করতেন তিনি। সেখানে কৃষিকাজের পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা জানিয়েছিলেন, মুম্বই শহরে শুধু সিনেমার কাজ করতে আসেন। বাকি সময়টুকু কৃষিকাজের মধ্যে পার করেন।
১৯৭৮ সালে মুজফফর আলির ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে রূপোলি পর্দায় পা রেখেছিলেন নানা পাটেকর। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি উপহার দিয়েছেন ‘পারিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘অঙ্গার’, ‘অপহরণ’, ‘খামোশি দ্য মিউজিক্যাল’-এর মতো চলচ্চিত্র। তিনি তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। এ ছাড়া চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার ঘরে তুলেছেন। শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে তাঁকে ভারত সরকার চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করে।
ইএইচ/




