যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশীয় সংগীতের পরিসর গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। লন্ডনসহ বিভিন্ন শহরে এখন নিয়মিত আয়োজন হচ্ছে বাংলা গান, গজল, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত এবং সমসাময়িক ব্যান্ড মিউজিকের অনুষ্ঠান। এই বিস্তারের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে: কীভাবে ঐতিহ্যবাহী সংগীতের নিজস্ব আবহ, কণ্ঠের স্বাভাবিকতা, বাদ্যযন্ত্রের স্বর এবং পরিবেশনার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আধুনিক ব্রিটিশ ভেন্যু ও ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের মধ্যে অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।
এখানেই আলাদা হয়ে ওঠে আরাফাত কীর্তির কাজ। বাংলাদেশে স্টুডিওভিত্তিক সংগীত প্রযোজনা, মিক্সিং ও মাস্টারিংয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে যুক্তরাজ্যে কাজ শুরু করার পর তাঁর পেশাগত চর্চা ক্রমে লাইভ মিউজিকের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। তবে তাঁর কাজকে কেবল ‘সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’ বললে পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না। কারণ তাঁর লাইভ মিক্সিংয়ের মূল শক্তি প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং সংগীতের চরিত্র বুঝে সেই অনুযায়ী শব্দের ভারসাম্য তৈরি করার সক্ষমতায়।
দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই মঞ্চে কখনও ধ্রুপদী বা মেলোডিক পরিবেশনা, কখনও গজল, কখনও উৎসবমুখর ব্যান্ড সাউন্ড, আবার কখনও একেবারে সংযত অ্যাকুস্টিক পরিবেশনা থাকতে পারে। প্রতিটি ধারার জন্য একই ধরনের সাউন্ড প্রয়োগ করলে সংগীতের নিজস্বতা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আরাফাত কীর্তির কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি একটি নির্দিষ্ট ‘সিগনেচার সাউন্ড’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন না। বরং পরিবেশনার ধরন, রেপার্টরি, ভেন্যুর অ্যাকুস্টিক চরিত্র এবং শ্রোতার প্রত্যাশা অনুযায়ী তাঁর লাইভ মিক্সের ভাষা পরিবর্তিত হয়।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় ও দক্ষিণ এশীয় ঐতিহ্যভিত্তিক সংগীতে তাঁর কাজ আরও সূক্ষ্ম। দীর্ঘদিনের তবলা প্রশিক্ষণ, পাশাপাশি গিটার ও পিয়ানোর সঙ্গে পরিচয়, তাঁকে রিদম, তাল, হারমনি এবং অ্যারেঞ্জমেন্ট সম্পর্কে এমন একটি ধারণা দিয়েছে যা অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দক্ষতার বাইরে। ফলে তাঁর কাছে লাইভ সাউন্ড মূলত ফ্রিকোয়েন্সি, লেভেল, কম্প্রেশন বা রিভার্বের সমষ্টি নয়। এগুলো তাঁর কাছে সংগীতের আবেগ, গতি এবং অভিব্যক্তি নির্মাণের উপকরণ।
আরাফাত কীর্তি একদিকে দক্ষিণ এশীয় বাদ্যযন্ত্র, তাল, কণ্ঠভঙ্গি এবং পরিবেশনা বোঝেন, অন্যদিকে আধুনিক ব্রিটিশ লাইভ প্রডাকশন পদ্ধতির সঙ্গেও নিয়মিত কাজ করেন। এই দুই জগতের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার সক্ষমতাই তাঁকে একজন প্রচলিত লাইভ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে আলাদা করে।
যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশীয় সংগীতের বিস্তৃত পরিসরে এই ধরনের কাজের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক মানের লাইভ প্রডাকশন তৈরি করতে পারা এখন শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার বিষয় নয়; এটি সাংস্কৃতিক এবং সৃজনশীলতার সমন্বয়।
আরআর




