বেহালা বাদক থেকে বাংলা সংগীতের দিকপাল হয়ে উঠেছিলেন। তাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় আবর্তিত হয়েছে দেশের সংগীতাঙ্গন। বলছিলাম কিংবদন্তি সুরকার সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলীর কথা। আজ ৯ আগস্ট তার চলে যাওয়ার অর্ধযুগ। এ উপলক্ষে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন এ সুর সম্রটের কন্যা সংগীতশিল্পী আলিফ আলাউদ্দিন।
আলাউদ্দিন আলীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর গানগুলো সবাইকে গাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন...
বাবার গানগুলো সেলিব্রেট করতে এ উদ্যোগ। সবাই যেন ওনার গান একসঙ্গে গাইতে পারে। কেননা গানগুলো গাইলে-ই পরের প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছাবে। তাছাড়া যারা কাভার করবেন তারা নিশ্চয়ই শ্রদ্ধাভরে গাবেন এবং বাবাকে উৎসর্গ করবেন। ওই জায়গা থেকেই এরকম চিন্তা।
দিনটি আপনার কেমন কাটে?
কবরস্থানে যাই। এতিমখানায় খাবার পাঠাই। কোনো ইভেন্টে অংশ নিই না। বাসায় থাকি। নিজের মতো কাটাই। দোয়া পড়ি।
আলাউদ্দিন আলীর ব্যস্ততা কতটা দেখেছেন?
ওনার ব্যস্ততার পুরোটাই দেখেছি। কেননা আমার জন্মের পর আব্বু (আলাউদ্দিন আলী) ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে। সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন। আমার চোখের সামনে তার প্রায় সবগুলো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া। তার সব জনপ্রিয় গানগুলো সৃষ্টি হয়েছে বাসায়। এ এক অন্যরকম অনুভূতি।
আপনি আলাউদ্দিন আলীর সন্তান— বিষয়টি কীভাবে নাড়ায়?
আমার বাবা বিশাল মাপের শিল্পী— উপলব্ধিটা সবসময় ছিল। কিন্তু চলে যাওয়ার পর সবাই যেভাবে তার শূন্যতা অনুভব করেছে, যেভাবে অনুরাগীদের বলতে শুনেছি যে, ওনার অভাব পূরণ হবে না— তখন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। বুঝতে পেরেছি ওনার গানগুলো দেশের মানুষের কাছে কত গভীরভাবে পৌঁছেছে!
আলাউদ্দিন আলীর গানগুলো সংরক্ষণে কোনো ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিচ্ছেন?
সেরকম ভাবছি না। কেননা গানগুলো বিভিন্নভাবে আর্কাইভ করা আছে। তাছাড়া আমি বিএলসিপিএস নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এটি কপিরাইট, রয়্যালিটি নিয়ে কাজ করে। সেখানে থেকে সন্তান হিসেবে যতটুকু সম্ভব করছি।
রাষ্ট্রের কাছে আলাউদ্দিন আলী কতটা মূল্যায়ন পেয়েছেন বলে মনে করেন?
জানি না কতটুকু মূল্যায়ন পেয়েছেন। তবে আমার মনে হয় আলাউদ্দিন আলী স্বাধীনতা পদক ও একশে পদকের যোগ্য ছিলেন। কিন্তু তিনি সেটা পাননি। এ নিয়ে সন্তান হিসেবে আমার দুঃখবোধ আছে। যদিও বাবা পুরস্কার নিয়ে তেমন ভাবতেন না। কিন্তু এখন মনে হয় জীবদ্দশায় পুরস্কারগুলো পেলে বাবা অনেক খুশি হতেন। মরণোত্তর দিয়ে লাভ নেই। কেননা বাবা-ই নেই। তবে সন্তান হিসেবে খুশি হব।
আপনার গানে আলাউদ্দিন আলীর প্রভাব কতটা?
আমার বাবা-মা দুজনেই সংগীতের মানুষ। এই পরিবারে না এলে মনে হয় না আমি মিউজিক করতাম। আমার প্রথম অ্যালবামটাও বাবা করে দিয়েছিলেন। আমি তখনও অ্যালবমের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। বাবা এসে বললেন— চলো, তোমার একটা অ্যালবাম করব। অর্থাৎ বাবা আমাকে ধরে নিয়ে এসেছেন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে। যদিও আমার ঘরানা আলাদা। কিন্তু সবসময় মাথায় থাকে— আমি কোন পরিবার থেকে এসেছি, কী ধরনের গান করছি। ফলে সেখানেও বাবা-মায়ের ছাপ থাকে। আর বাবা অনেক মডার্ন কম্পোজার ছিলেন। সব ধরনের গান শুনতেন। বাবার সঙ্গে বসে ইংরেজি গান শুনতাম। এজন্য কখনও মনে হয়নি ওনার ঘরানার বাইরে চলে গেছি। মনে হয় বাবার একটা ধারা ধরে রেখেছি।
বাবা-মেয়ে হিসেবে আলাউদ্দিন আলী-আলিফ আলাউদ্দিনের সম্পর্ক কীরকম ছিল?
বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সবসময় ভালো ছিল। কিন্তু বাবা-মায়ের সেপারেশনের বড় প্রভাব আমার ওপর পড়েছিল। একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল। তখন বয়স কম ছিল। যদিও পরে সেটি কাটিয়ে উঠি। বাবার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। তবে ওই সময়টা আমার জন্য কঠিন ছিল।
বাবার সঙ্গে কোনো মজার ঘটনা?
ছোটবেলায় অনেকের মতো আমিও বিশ্বাস করতাম ফলের বিচি খেয়ে ফেললে পেটে গাছ হয়। তখন অনেক ছোট। কী যেন একটা ফলের বিচি গিলে ফেলেছিলাম। কান্নাকাটি করছিলাম। আব্বু তখন দুষ্টুমি করছিলেন। বলছিলেন, পেটে গাছ হবে, তখন কী করব! পরে আব্বু পানিতে লবণ চিনি কী যেন একটা গুলিয়ে খাইয়ে বললেন ঠিক হয়ে যাবে। আমিও বিশ্বাস করলাম যে ওইজন্য আমার মাথা দিয়ে গাছ ওঠেনি। এখন মনে পড়লে খুব হাসি পায়।
দেড় দশক পর অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন। কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
অ্যালবাম বের হওয়ার পর ভালো রেসপন্স পেয়েছি। একটা মিউজিক ভিডিও করেছি। বাকিগুলো নিয়ে পরিকল্পনা আছে। মাঝে ফুটবল বিশ্বকাপ গেল। ওটা নিয়ে উন্মাদনা ছিল। সেজন্য থেমে ছিলাম। এখন চেষ্টা করছি আরেকটি মিউজিক ভিডিও করতে। গানগুলোর লিরিক্যাল ভিডিও অনলাইনে আছে। সেগুলো থেকে বেশ সাড়া মিলেছে। সবাই পছন্দ করেছে।
আরআর









