ঢালিউড থেকে আমিন খানের দূরে থাকা আফসোসের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনেকের কাছে। জনপ্রিয় এ চিত্রনায়ককে কেন কাজে লাগানো হচ্ছে না— প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ ঝাড়তে দেখা গেছে সিনেমাপ্রেমীদের। বিরতি ভেঙে ‘গুলশানের চামেলি’ নামের একটি সিনেমায় যুক্ত হয়েছেন অভিনেতা। সেই সূত্র ধরে আলাপ জমেছিল ঢাকা মেইলের সঙ্গে।
‘গুলশানের চামেলি’তে যুক্ত হয়েছেন। অনেকে কামব্যাক বলছেন। কীভাবে দেখছেন?
কবে গেলাম আর ব্যাক করলাম এটাই বুঝলাম না। হয়তো অন্য কাজের চাপে গ্যাপ পড়ে গিয়েছিল। যেটা খুব স্বাভাবিক। প্রত্যেক শিল্পীর ক্ষেত্রেই এরকম হতে পারে। এছাড়া মনমতো প্রজেক্ট পাচ্ছিলাম না। তাই কাজ করা হচ্ছিল না। গুলশানের চামেলির গল্প শুনে মনে হয়েছে এখানে সুযোগ আছে। নতুনত্ব আছে। শুধু আমার না প্রত্যেক চরিত্রকে ভিন্নভাবে তুলে ধরার জায়গা আছে।
এই ছবিতে কী এমন আছে যা আপনাকে যুক্ত করল?
আমার কাছে যে ধরনের গল্প এসেছে সেগুলোতে ভিন্নতা পাইনি। মন হয়েছে অন্য কাউকে নিলেও হবে। শুধু পরিচিতির কারণে আমাকে চাইছে। সেসব কারণে করা হয়নি। তার মানে এই না যে ভালো গল্প হচ্ছে না। হয়তো সেগুলো আমার কাছে আসেনি। তবে এই গল্প শোনার পর ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। মানসিক স্বস্তিরও জায়গা আছে। এজন্যই যুক্ত হওয়া।
মো. ইকবালের ছবিতে যুক্ত হওয়ায় অনেকে হতাশ…
তাহলে কার ছবি করব? বাংলাদেশে এমন কোনো পরিচালক আছেন যিনি লিখে দিতে পারবেন তার ছবি সুপারহিট হবে? দেশের সবচেয়ে সুপারহিট ছবি ‘বেদের মেয়ে জোসনা’। মুক্তির আগে ওই সিনেমার পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল সাহেবকে কেউ চিনত না। ঢালিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বাজেটের ছবি ছিল ওটা। এমনকি রাজ দরবারে কার্পেট দেওয়ারও পয়সা ছিল না। অঞ্জু ঘোষ ম্যাডামের শাড়ি বিছিয়ে কার্পেটের কাজ চালিয়েছিল। কখন কার গল্প লেগে যায় ঠিক নেই। আজকাল সুপারহিট ডিরেক্টর হিসেবে অনেকের নাম শোনা যায়। কিন্তু শেষে দেখা যায় দুই-একটি ছবির পর আর চলছে না এবং সবগুলো ওই ‘কেজিএফ’ কিংবা ‘অ্যানিমেলে’র কপি-পেস্ট। নিজস্বতা নেই। তাদের একটি গ্রুপ থাকে। কেউ হয়তো গল্প লিখছে। কেউ ওভিসি টিভিসির মতো বিভিন্ন ছবি থেকে সুন্দর সুন্দর শট সাজিয়ে দিচ্ছে। তারপর স্পটে গিয়ে ওগুলোর দৃশ্যধারণ করছে।
ছবিতে কয়েক প্রজন্মের তারকা আছেন…
আশেপাশের দেশে এটা প্রচলিত। কেননা সিনিয়রদের সিনেমায় রাখলে গল্প ও স্ক্রিন সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু আমাদের এখানে দেখা যাচ্ছিল না। গ্রুপিং বা সম্পর্কের কারণে হতে পারে। তারা ওই সার্কেল থেকে বের হতে চাচ্ছিলেন না। মো. ইকবাল (গুলশানের চামেলির পরিচালক) বের হয়েছে। এটা তার জন্য সাহসী ও সময়পযোগী পদক্ষেপ।
একটা সময় মূলধারার বাংলা সিনেমায় মাল্টিকাস্টিংয়ের প্রচলন ছিল…
আলমগীর ভাই, রুবেল ভাই, মান্না ভাই, আমি একসঙ্গে কাজ করতাম। একটি সিনেমায় আলমগীর ভাই, ববিতা আপা, পূর্ণিমা, ওমর সানী ভাই, মিশা সওদাগর আর আমি ছিলাম। তবে আজকালকার শিল্পীদের অনেকে মাল্টিকাস্টিংয়ে ভয় পান। হয়তো ভাবেন তাদের কিছু করার সুযোগ থাকবে না। আমি-ই বলতে শুনেছি, সিনিয়র আর্টিস্ট থাকলে কাজ করব না। এতে স্ক্রিনটা সমৃদ্ধ হয় না। একজন কখনও গোল দিতে পারে না। গোল দিতে ১১ জন-ই লাগে। মেসির যেমন দরকার হবে তেমনই অন্যান্য শক্তিশালী খেলোয়াড়ও দরকার। দল শক্ত না হলে মেসি সারা মাঠে খেলে গোল দিতে পারবেন না। তাই প্রতিটি জায়গায় উপযুক্ত খেলোয়াড় লাগবে। কেন্দ্রীয় চরিত্রের বাইরে যে চরিত্রগুলো সেগুলো একটি সিনেমার পিলার। যেসব চরিত্রে আগে গোলাম মোস্তফা, এটিএম শামসুজ্জামান, রোজি আফসারী, হুমায়ুন ফরিদী থাকতেন। হুমায়ন ফরিদীকে শুধু খল অভিনেতার গণ্ডিতে আটকাতে পারবেন না। উনি যেকোনো চরিত্রে দাঁড়ালেই স্ক্রিন অন্য মাত্রা পেত। এরকম শিল্পী না থাকায় বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। যেটি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এটি চলমান থাকলে ভালো সিনেমা নির্মাণ কঠিন হয়ে পড়বে।

এবার নিয়মিত হবেন?
ইচ্ছা তো আছে। আমার পরিচিতিই সিনেমা দিয়ে। দেখা যাক কী হয়।
বিরতির সময়টায় লাইট-ক্যামেরা মিস করেছেন?
অবশ্যই মিস করেছি। কেউ যদি বলে মিস করি না সেটা ডাহা মিথ্যা। একটা সময় এখানে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতাম, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি— এটা অন্যরকম অনুভূতি। সৃষ্টিশীল কাজের আনন্দ-ই আলাদা। যিনি করেন তিনিই বোঝেন। এখানে পারিশ্রমিকই মুখ্য না। এই কাজের তৃপ্তি অন্যরকম। একজন মানুষ সাত-আট মাস পরিশ্রমের পর যখন কাজটি স্ক্রিনে দেখেন সেটার যে আনন্দ তা অর্থের মাপকাঠিতে বাধা যায় না। সেই কাজ থেকে যখন দর্শকের সাড়া পান তখন সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের পর্যায়ে থাকে না। এজন্য এসব খাতে যারা কাজ করেন তারা অন্য কোথাও মন বসাতে পারেন না।
ঢালিউডের রূপান্তর কীভাবে দেখছেন?
২০০০ সাল পর্যন্ত গণ মানুষকে লক্ষ্য করে ছবি নির্মাণ করা হতো। ২০০০-এর পর দেখলাম সাধারণ মানুষ থেকে সিনেমা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। গোষ্ঠী কেন্দ্রিক হচ্ছে। ব্যক্তির সন্তুষ্টির জন্য হচ্ছে। আমাকে বুঝতে হবে সাধারণ দর্শক কী চান। তাদের লক্ষ্য করে সিনেমা বানানো উচিত। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত।
গেল কয়েক বছরে ঢালিউডে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো আপনার দৃষ্টিতে কেমন?
কিছু সিনেমা একবারেই ওভাররেটেড মনে হয়েছে। দেশের সংস্কৃতির সাথে মিল পাইনি। মনে হয়েছে ভিনদেশি সিনেমা দেখছি। দক্ষিণী সিনেমা দ্বারা খুব করে প্রভাবিত। তাদের অনুকরণ করতে গিয়ে সিনেমার বাজেট এত বেড়েছে! দক্ষিণীরা পারছে কারণ তাদের মার্কেট বড়। আমাদের বাজার অত বড় না। এদিকে ফেসবুকে বলা হচ্ছে, ছবি সুপারহিট, এত টাকা লাভ হচ্ছে। কিন্তু ছয়-সাত মাস পর শোনা যায় ৮-১০ কোটি, ১০-১৫ কোটি লোকসান। প্রযোজক একবার সিনেমায় লগ্নির পর আর ফিরছেন না। লাভ হলে বানাবেন না কেন! পরিচালকদের দেখি ছবি সুপারহিট বলে লাফাতে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে তার আর কোনো ছবি দেখি না। সুন্দর জামা কাপড় পরে ইন্টারভিউয়ে গিয়ে ছবি ব্যবসা সফল বলে বেড়ায়। কিন্তু নিজে হিট হওয়া ছাড়া কিছুই হয় না।

সম্প্রতি আপনার লেখা গান প্রকাশ পেয়েছে…
এক সকালে বৃষ্টি হচ্ছিল। হঠাৎ মনে হলো কোনোদিন তো গান লিখিনি। দেখি চেষ্টা করে! এভাবেই লেখা। অনেকে বলেছেন খুব সুন্দর হয়েছে। কেউ জানতে চেয়েছেন, আবার লিখব কবে। মুড এলে লিখব। যদিও এরমধ্যে কয়েক লাইন লিখেছি। এই তো সেদিন বান্দরবান গিয়েছিলাম। পাহাড়ের ওপর বিশাল বড় বারান্দার মতো— একটি জায়গায় ডিনার করছিলাম। রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখা যায়। একটি মোমবাতি জ্বলছিল। মনে হচ্ছিল দুই লাইন লেখা উচিত। চুপচাপ বসেছিলাম। হঠাৎ দুই লাইন বের হলো। ওই দুই লাইন নিয়েই নাড়াচাড়া করছি। সব মিলিয়ে বারো লাইন হলেই শুনতে পাবেন।
আরআর







