রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সাক্ষাৎকার

শাফিন কী চিন্তা করত আমি বুঝে যেতাম: হামিন আহমেদ 

রাফিউজ্জামান রাফি
প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

শেয়ার করুন:

শাফিন কী চিন্তা করত আমি বুঝে যেতাম: হামিন আহমেদ 
২৮ জুলাই বাবা-মা উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগমের জন্ম। বাবার চলে যাওয়া-ও ২০ জুলাই। বছর দুয়েক ধরে যুক্ত হয়েছে ছোট ভাই ব্যান্ড তারকা শাফিন আহমেদের বিয়োগের দিন (২৪ জুলাই)। মাসটি যেন সুখ ও শোক পাশাপাশি বয়ে বেড়ান  জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলসের অন্যতম সদস্য হামিন আহমেদ। গতকাল শনিবার তার সঙ্গে কথা হয় ঢাকা মেইলের। 

মাসটি আপনার কেমন কাটে? 

মাসটি আমার কাছে মিশ্র অনুভূতির। আগে বাবা-মায়ের জন্মদিন ছিল। তখন একরকম ছিল। বছর দুয়েক ধরে আরেক রকম। লসটা সবসময় মনে করিয়ে দেয়। বাবা-মায়ের জন্মদিন কিন্তু তারা নেই। ছোট ভাই— সেও নাই।

7edd76efd3f144080da3742373d779e7-66a1a699b221f

 

দুই বছর হলো শাফিন আহমেদ নেই। একা বোধ করেন? 

শাফিন মাইলসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল। তার শূন্যস্থান পূরণ হবে না। মাইলসের যাত্রা ৪৬ বছরের। এরমধ্যে ৩৮ বছর আমরা একসঙ্গে। ওই সময়টা সর্বশ্রেষ্ঠ। মাইলসকে এই পর্যায়ে আনতে যা করেছি সব একসঙ্গে। সবসময় তাকে মিস করি। বিশেষ করে দুটি কারণে। প্রথমত সে ছিল বিগার দ্যান লাইফ। তার ব্যক্তিত্ব, বাচনভঙ্গী, আচরণ, নিজেকে ক্যারি করা, স্টাইল, পোশাকাদি, স্টেজ প্রেজেন্স— সবকিছুতে স্বকীয়তা ছিল। যেটা হুট করে আরেকজনের এসে পূরণ করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত ওর বেস প্লেয়িং, গায়কী। আগে আমরা গান ভাগাভাগি করতাম। ওর গানগুলোর হারমনি আমি করতাম। আমারগুলোর হারমনি ও করত। শাফিনের ভয়েস আর আমার ভয়েস যখন একসঙ্গে গান বা হারমনি করত তখন ভিন্ন মাত্রা যোগ হতো। 

মাইলসে আপনার ও শাফিন আহমেদের পথচলা কেমন ছিলেন? 

শাফিনের সঙ্গে ব্যান্ডের প্রতিটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। কোন শোয়ে কী করব, কে আগে উঠবে, নাকি ড্রামস দিয়ে শুরু করব, কোন গানগুলো থাকবে— সব। দেশের বাইরে ট্যুরের বেলায় আরও আলোচনা হতো। সে না থাকায় সব আমাকে সামলাতে হয়। শাফিন থাকাকালীন আমি মজা করতে পারতাম। স্টেজে সে গাওয়ার সময় আমি অনেক সক্রিয় থাকতাম। আমি গাওয়ার সময় সে। সেটা ভীষণ মিস করি। এখন সব গান আমাকে গাইতে হয়। ওর গাওয়া গানগুলোতে বিশেষ খেয়াল দিতে হয় যেন আবেদনটা ঠিক থাকে। ফলে অধিকাংশ সময় মাইকে ব্যস্ত থাকতে হয়। আগের সেই ফানটা মিস করি। তবে আমাদের মধ্যে যাই হোক প্রত্যেকেই তাকে সম্মান করে এসেছি। প্রত্যেক শোয়ে শাফিনের সেগমেন্ট থাকে যেখানে তাকে ট্রিবিউট করে গান করা হয়। 

miles

 

দুজনের বোঝাপড়া কেমন ছিল?

আমাদের দুজনের মধ্যে অনেক মিল ছিল। চিন্তাও কাছাকাছি ছিল। কিছু ব্যাপার ছিল একদম এক। ও কী চিন্তা করত আমি বুঝে যেতাম। কোন কথা কেন বলল কিংবা কাজটি কেন করল— অন্য কেউ না বুঝলেও আমি বুঝতে পারতাম। কথা বলার সময় কোন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না, কোনটা কীভাবে দিতে হবে কিংবা বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে কীভাবে কথা বলতে হবে— ও আমার ওপর, আমি ওর ওপর নির্ভর করতাম। স্টেজ কেমন হবে, সাউন্ড কী হবে অর্থাৎ ম্যানেজমেন্টের বিষয়গুলো আমি বুঝতাম। ও মার্কেটিংয়ের দিকটা। মাইলসকে সামনে নেওয়ার বিষয়গুলো অর্থাৎ প্রমোশন, ব্র্যান্ডিং ভালো বুঝত। দেখা যেত অনেক জায়গায়  সম্মানী সেভাবে দেবে না কিন্তু আমাদের বাজানো উচিত— এগুলোও সে দেখত। টেলিভিশনগুলোর সাথে সে-ই যোগাযোগ রাখত। জর্জ হ্যারিসনের গান বাংলায় করার পরিকল্পনাও ওর ছিল। 

শাফিন আহমেদের কোন দিকগুলো বেশি পছন্দ করতেন? 

শাফিন ভীষণ গোছানো মানুষ ছিল। ওর এই দিকটি আমি সবচেয়ে পছন্দ করতাম। কোনো কিছুই হালকাভাবে নিত না। ছোটখাট বিষয়ও সিরিয়াসভাবে নেওয়ায় আমি মাঝে মাঝেই কটাক্ষ করতাম। ওর সময়ানুবর্তিতাও ছিল শেখার মতো। ব্রিটিশদের মতো ৯টা মানে ৯টা, ১০টা মানে ১০টা। ভালো মানুষ ছিল। শিল্পী হিসেবে তার গায়কী। এই জিনিসগুলো আমার খুব ভালো লাগত। সবসময় মানুষ আমাদের নাম চেহারা গুলিয়ে ফেলত। ওকে হামিন আমাকে শাফিন ভাবত। একসময় বাজি ধরতাম— নাম বলে দেওয়ার পরও ভুল হবে। তাই হতো। এগুলো খুব মনে পড়ে। 

firoja

 

বাবা-মায়ের পরিচয় আপনাদের পথচলায় কতটা প্রভাব ফেলেছে? 

সংগীতে আমার বাবা-মা দুজনেই জায়েন্ট। কমল দাশগুপ্ত গোটা উপমহাদেশে একজন-ই ছিলেন। ভারতের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞরা তাকে যে কীভাবে সম্মান করত! তখন ছোট ছিলাম। বুঝতাম না। ভাবতাম ওনাকে দেখে এরকম করছে কেন! এখন বুঝি লন্ডনে প্রাথমিক পরিচয়ে আশা ভোঁসলে শাফিনকে সাধারণ সৌজন্যতা দেখালেও পরে কমল দাশগুপ্তের ছেলে শুনে কেন লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরছিলেন। ফিরোজা বেগম বলতেও আমরা ভারত-বাংলাদেশে একজনকেই বুঝি। একটি ঘটনা বলি। আমাদের বন্ধু ও ভাই-বেরাদারদের থেকে শোনা। মাইলসের প্রোগ্রাম হবে শুনলে ইয়ং জেনারেশন টিভির সামনে বসত। তাদের মা-বাবারাও বসতেন। দেখি তো কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগমের ছেলেরা কী করে— এই চিন্তা থেকে। দেখে বলতেন, ভালো করেছে। আমরা খুব পরিপাটি থাকতাম। এটা পরের জেনারেশনকে মিউজিকে আসতে সুবিধা করে দিয়েছিল। তারা বলত, ভাইয়া আপনাদের জন্য আমাদের মিউজিক করা সহজ হয়েছে। বাসায় আপনাদের উদাহরণ দিলে বাবা-মা মিউজিকে বাধা দেননি।

সংগীতে আপনাদের অর্জন বাবা-মাকে কীরকম আলোড়িত করত? 

বাবা দেখে যেতে পারেননি। মা দেখেছেন। একটি ঘটনা বলি। মা গাড়িতে বসে বাজার করতেন। একদিন বাজার করে এসে খাবার টেবিলে বসলেন। আমি আর শাফিন দুজনেই ছিলাম। দেখলাম খবু খুশি খুশি চেহারা। বললেন, জানিস আজ কী হয়েছে! তারপর শোনালেন, তিনি যখন বাজার করছিলেন তখন অনেকে বলছিলেন ওই যে মাইলসের মা। 

আমি আর শাফিন তখন প্রচুর শো করতাম। একবার এক টেলিভিশনে লাইভ ছিল। এরকম অনুষ্ঠানে প্রস্তুতির ব্যাপার থাকে। কিন্তু আগের দিন লম্বা শো ছিল। বিশ্রাম নেওয়ার সময় পাইনি। জার্নি করে এসেই জয়েন করি। পরদিন মা বললেন, কালকে তোমাদের একটা প্রোগ্রাম দেখলাম। গানগুলো সুন্দর হয়েছে। কিন্তু গলার ওপর এভাবে চাপ দিও না। কণ্ঠ একটি প্রাকৃতিক মাসল। সেটাকে যাচ্ছে ভাবে ব্যবহার করতে পারো না। সমালোচনা ও প্রশংসা অকপটে করতেন। ওনার প্রিয় গান ছিল ‘প্রথম প্রেমের মতো’। 

image-360289

 

কমল দাশগুপ্ত-ফিরোজা বেগমের ছেলেরা পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে মেতেছে— শুরুতে এরকম কটাক্ষ শুনতে হতো? 

আমাদের যাত্রার শুরুতে এই কথাটা খুব প্রকট ছিল। তবে মা বাবা কখনও এভাবে চিন্তা করেননি। কারণ গ্রেট ক্রিয়েটররা জানেন সংগীত প্রবাহিত হয়। এটাকে খোলা মনে চিন্তা করতে ও শুনতে হবে। আমি আর শাফিন যখন পাগলের মতো ব্যান্ড সংগীত নিয়ে পড়লাম তখন মা শুধু বলছিলেন, যাই করো ভালোভাবে করো। তবে বাংলাদেশের অনেকেই বাঁকা চোখে দেখতেন এবং আজও দেখেন। ১৯৯১ সালে ‘প্রতিশ্রুতি’ যখন করি তখন বোদ্ধাদের অনেকে বলেছিলেন— এগুলো আজ আছে কাল নেই। ৪৬ বছর পর এসে দেখছি মাইলস, এলআরবি, নগর বাউল, সোলস, ফিডব্যকাকসহ ব্যান্ডের গানগুলো বাংলাদেশের মিউজিকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। 

ব্যান্ড সংগীতে মাইলসের ভূমিকা নিয়ে শুনতে চাই। 

মাইলস শুধু গান-ই দেয়নি। দেশের ব্যান্ড সংগীতে শক্ত ভূমিকা রেখেছে। দুঃখের বিষয় সেসব মিডিয়ায় তেমনভাবে উঠে আসেনি। দেশের ব্যান্ডে প্রথম যা সব মাইলসের। মাইলস যখন প্রথম ইংরেজি অ্যালবাম করে তখন কোনো প্রোডাকশন বা রেকর্ড কোম্পানি ছিল না। আমরা এক হাজার ক্যাসেট কিনে কপি করে নিজেরাই বিক্রি করেছি। যেটা ছিল ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম। ব্যান্ডের প্রথম সিডি আমরা করছি। আমেরিকার ডিস্কো রেকর্ডিং থেকে বেরিয়েছিল। এমটিভি ইন্ডিয়ায় বাংলা গানের যে প্রথম মিউজিক ভিডিও প্রচার হয় সেটাও আমাদের ছিল। সিএনএন আমাদের ইন্টারভিউ করেছে। চ্যানেল ভি আমাদের কনসার্ট কভার করেছে। ‘প্রতিশ্রুতি’ অ্যালবামের ছবি মুনীর চৌধুরীর ছেলে ফটোগ্রাফার আসিফ মুনীরের তোলা। ওটা ব্যান্ডের অ্যালবামের প্রথম ফটোশুট। 

১৯৯২ সালে বামবা ওপেন এয়ার কনসার্ট করে। তখন কোনো ডেকোরেটর ছিল না, ৩৬ ফিট স্টেজ কীভাবে হবে, কোথা থেকে ইলেক্ট্রিসিটি নিতে হবে— কেউ জানত না। আমি তখন বামবার প্রেসিডেন্ট। রাত ৩টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে করেছিলাম। আমি নিজেই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। এলআরবির প্রথম শোসহ অনেক ব্যান্ডের সাউন্ড আমার করা। এসব উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাইছি শুধু গান না পুরো সিস্টেম সেটিং আমাদের হাতে হয়েছে। সেটা নিঃস্বার্থভাবে করেছি। 

আরআর 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর