চরিত্রের ভেতর নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে আনিসুল হক বরুণের। দর্শক তাঁকে চেনে ‘সাকিন সারিসুরি’র মান্নান, ‘হাড়কিপ্টে’র দড়ি বাবা কিংবা ‘আলতা সুন্দরী’র হাশেম জুয়ারি হিসেবে। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা এবং ফটোগ্রাফিতেও সিদ্ধহস্ত। লেখালেখিতেও কম যান না তিনি। সম্প্রতি ঢাকা মেইলের সঙ্গে আলাপ জমেছিল বরুণের।
অভিনেতা, নির্দেশক, আলোকচিত্রী, কবি— কোন পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
আমি মনে করি, যেই মানুষেরা আমাকে যেভাবে চেনেন, সেই মানুষদের কাছে সেইটাই আমার পরিচয়। আমরা যখন যেই ধরণের কাজ করি, সেই কাজের পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং পরিণতি অনুযায়ী আমাদের পরিচয় তৈরি হয়। যেমন অনেকেই হয়তো জানেন না যে আমি বিশেষ এক ধরনের ফটোগ্রাফি করি। চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে সেগুলোর এক্সিবিশনও হয়েছে। সেজন্যই বলছিলাম— যারা আমাকে যেভাবে চেনে, তাদের কাছে সেটিই আমার পরিচয়।

বেশ কিছুদিন অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন। বিরতির কারণ কী?
এটা বিরতি কি না জানি না, তবে ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত পাঁচ বছর কাজ একটু কম করেছি। এ সময়ের মধ্যে প্রতিবছর ঈদের নাটক বিশেষ করে, সালাউদ্দিন লাভলু ভাই এবং আমাদের বন্ধু নির্দেশকদের বেশ কিছু সিঙ্গেল নাটক করা হয়েছে। কিন্তু নিয়মিতভাবে ধারাবাহিকের কাজ করা হয় নাই। এর অবশ্য দুটি কারণ ছিল। এক, আমি তখন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের অডিও-ভিজ্যুয়াল ডিপার্টমেন্টের প্রধানের চাকরি করি। নাটকের সাথে আমার শিডিউলের খুব একটা সমঝোতা হচ্ছিল না। যদিও অভিনয়ের ব্যাপারে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কোনো আপত্তি ছিল না। দুই, ‘সাকিন সারিসুরি’ নাটকে ‘মান্নান’ চরিত্রটি জনপ্রিয় হওয়ার পর আমাকে একই ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডাকা হচ্ছিল। একজন অভিনেতা হিসেবে আমি শুরু থেকেই ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে কাজ করতে চেয়েছিলাম। চাওয়া-পাওয়ার বৈপরীত্য একটা কারণ।
সাকিন সারিসুরির মান্নান, হাড়কিপ্টের দড়ি বাবা, আলতা সুন্দরীর হাশেম জুয়ারিসহ বেশকিছু জনপ্রিয় চরিত্রে কাজ করেছেন। চরিত্রের বৈচিত্র্য কেমন উপভোগ করেন?
চরিত্রের বৈচিত্র্য আমি খুব উপভোগ করি। আমি মনে করি, একজন অভিনয়শিল্পীর প্রধান কাজই হচ্ছে বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করা।

মঞ্চে খল চরিত্রে অভিনয় করলেও টেলিভিশনের পর্দায় হাস্যরসাত্মক চরিত্রে বেশি দেখা গেছে। কারণ কী?
এটাও খুব সাধারণ একটা কারণে, আমি থিয়েটার করি ১৯৮৭ সাল থেকে। নব্বই বা দুই হাজারের দশকের মধ্যে মঞ্চ নাটকের চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে অদ্ভুত এক ধারণার বেশ প্রচলন ছিল। সেটা অনেকটা এরকম, সুন্দর চেহারার ছেলে মেয়েরা সবসময়ই হিরো বা হিরোইন হবে। অর্থাৎ, পজিটিভ ভাইবের চরিত্রগুলোতে অভিনয় করবে। আর অপেক্ষাকৃত একটু ‘পঁচা’ চেহারার ছেলেমেয়েরা অভিনয় করবে খল চরিত্রে। আমার ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যত্যয় হয়নি।
আপনারা অনেকেই জানেন, ২০০৭ সালের দিকে বৃন্দাবন দাসের রচনা ও সালাউদ্দিন লাভলু ভাইয়ের নির্দেশনায় ‘সাকিন সারিসুরি’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আমার সিরিয়ালের হাতেখড়ি। আমি মনে করি, একজন অভিনেতা হিসেবে চরিত্রকে এনজয় করব এটাই স্বাভাবিক। মান্নান চরিত্রের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক কাজটি-ই করেছিলাম। সে সময় চরিত্রটি দর্শকদের কাছে খুব সমাদৃত হয়ে উঠল। জনপ্রিয়তার কারণে নির্মাতারা আমাকে একই রকম চরিত্রে ডাকতে শুরু করলেন। যেহেতু ওই সময় কমেডি ঘরানার নাটকের ট্রেন্ড ছিল তাই আমরা কমেডি শুরু করে দিয়েছিলাম। এখন সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। গল্পের ক্ষেত্রেও অনেক রকম এক্সপেরিমেন্ট চলছে। সময়ের সাথে সাথে কাজের ধরন বদলেছে। এখন অনেক চরিত্র নিয়ে এক্সপেরিমেন্টাল অভিনয় করছি। বেশকিছু সিরিয়াস ধাঁচের খল চরিত্রেও অভিনয় করেছি। ইতোমধ্যে কয়েকটি কাজ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে, যেগুলো আগের কাজগুলোর সাথে কোনো মিল নেই, একদমই আলাদা।

কখনও প্রাপ্তির হিসাব মিলিয়েছেন?
না! এই ধরনের হিসেব আমি কখনোই মেলাতে যাইনি। ভাবনাতেও খুব একটা লালন করি না। এর কিছু যৌক্তিক কারণ আছে। এ ধরনের চিন্তা মানুষ তখনই করে, যখন কেউ মনে করে তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে অথবা তার জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষার সমাপ্তি ঘটেছে। যেহেতু, আমি কখনোই মনে করি না আমার ক্যারিয়ার বা আশা-আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে গেছে, সেহেতু কখনোই হিসাবও করা হয়ে ওঠেনি। এই ‘হওয়ার বা করার কথা ছিল’ ব্যাপারটাও আরেক ধরণের ফ্যান্টাসি। এই কথা কে কাকে দিয়েছিল? আমি কি কাউকে কথা দিয়েছিলাম? নাকি কোনো একদিন ঘুমের মধ্যে, আলাদিনের দৈত্যের মতো কেউ একজন আমার কাছে এসে বলেছিল, ‘তুই কিন্তু এই হবি!’ বিষয়টা তো এরকম না। আমরা নিজের আগ্রহ এবং সক্ষমতাকে কল্পনার সাথে মিলিয়ে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান তৈরি করি, যেটা রোমান্টিসিজম এবং ফ্যান্টাসির প্রভাবে আবর্তিত হতে থাকে। বাস্তবতার সাথে যার কোনো রকমের বাস্তবিক সম্পর্ক নেই। আমার এখনও অনেক কিছু করার বাকি আছে। তাই এখনই প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে চাই না।

ওটিটিতে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন? বেশি দেখা যাচ্ছে না সেখানে...
বেশি দেখা যাচ্ছে না কেন— আমি কীভাবে বলব! এই প্রশ্নের উত্তর আমার থেকে ভালো জানেন নির্দেশক, প্রযোজক ও পরিবেশকেরা! ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজের পরিবেশ খুবই পেশাদার। এখানে কাস্টিং ডিরেক্টর থেকে শুরু করে মেকআপ আর্টিস্ট, লাইট, সেট, কস্টিউম, আর্ট, সিনেমাটোগ্রাফি এবং নির্দেশনা প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্ট তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে। এর একটা বড় কারণ হচ্ছে, এখানে যারা কাজ করছে তাদের বেশিরভাগ মানুষ তাদের অঙ্গন সম্পর্কে পড়াশোনা শেষ করে তারপরে কাজ করতে এসেছে। কাজের পরিবেশ সৃষ্টির পেছনে আরেকটি বড় কারণ বাজেট। টেলিভিশনের নাটক থেকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজগুলোর বাজেট অনেক গুণ বেশি থাকে। যে কারণে তারা এতটা পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করার স্বচ্ছলতা অনুভব করতে পারে। যেটা নাটকগুলোতে পারে না।

একজন চরিত্রাভিনেতার জীবনে স্ট্রাগল কেমন?
প্রাণীকুলে প্রায় সবার সাথেই স্ট্রাগল শব্দটার গভীর একটা সম্পর্ক আছে। ঠিক একইভাবে শুধু চরিত্রাভিনেতাই নয়, যেকোনো অভিনেতারই স্ট্রাগল সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে বলেই আমি মনে করি। ক্যারিয়ারের শুরুতে, বিরতির পর কিংবা এখন— সব সময়ই কাজের মধ্যে আছি। তবে আগের চেয়ে নাটকের গল্প এবং নির্মাণের ধরন এখন অনেকটা বদলে গেছে। পারিবারিক গল্পের নাটক তেমন একটা হচ্ছে না। এখন অল্প কয়েকজন শিল্পী দিয়ে নাটক শেষ হচ্ছে। তাছাড়া নাটক বা সিনেমার পেছনে একটা ব্যবসা জড়িয়ে। যিনি অর্থ লগ্নি করছেন, দিন শেষে তার লাভের কথা চিন্তা করে তিনি অভিনেতা নির্বাচন করবেন। যাকে দিয়ে যদি ব্যবসা হচ্ছে না, প্রযোজক বা পরিচালক তাকে কেন কাজে ডাকবেন? এক্ষেত্রে আমার একটা সুবিধা আছে, মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, ফজলুর রহমান বাবু ভাইদের বা আমরা যারা ‘সাকিন সারিসুরি’, ‘আলতা সুন্দরী’ অথবা ‘জামাই মেলা’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকে একসময় একসাথে কাজ করেছি। সেই সব শিল্পীদের সাথে দীর্ঘদিন পথ চলার কারণে একটা স্ট্রং কেমিস্ট্রি তৈরি আছে। যেটা অভিনয়ের জন্য খুবই কাজের। এসব কারণে কাজের ডাক এখনও আসে।

এ পর্যন্ত যত কাজ করেছেন, তার কত শতাংশ করে মনে হয়েছে, মনের মতো হলো?
কাজের পরিতৃপ্তি নিয়ে বলাটা খুব কঠিন। একজন অভিনেতা তার নিজের কাজ দেখে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়েছেন, এই ধরণের ঘটনা খুবই কম ঘটে থাকে। আমি যখন নিজের কাজ দেখি, তখন মনে হয় সংলাপটা এভাবে না বলে যদি ওভাবে বলা যেত তাহলে আরেকটু ভালো হতো। ওভাবে না হেঁটে অন্যভাবে হাঁটলে ঠিক ছিল। এরকম কারেকশন হতেই থাকে। কোনো কোনো অভিনীত অংশ অথবা কোনো কোনো চরিত্রের চিত্রায়ণ দেখে, মাঝে মাঝে আনন্দিত হয়েছি। নিজেকে অভিনন্দিতও করেছি।
দর্শকদের সঙ্গে মজার কোনো ঘটনা...
২০১৪ সালের ঘটনা। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের দিকে হবে, হালকা শীত পড়েছে। ‘যুদ্ধ পুরাণ’ নাটকটির নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি। সেরকম কোনো একটা সময়। তখন আমি গলায় কয়েক ধরনের চেইন লকেটসহ ব্যবহার করি। হাতে ব্রেসলেট, সুতা বেশ কয়েক পদের। পরনে জিন্স, পায়ে বুট, গায়ে হালকা একটা জ্যাকেট, কলার উঁচু করে তোলা। মাথায় ক্যাপ। এটা আমার গেটআপ। শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকের মহড়া শেষ করে নিচে চা খেতে এসেছি। এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি ‘সাকিন সারিসুরি’ নাটকের মান্নান?” আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। তিনি জানালেন, তিনি প্রায় ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে আমাকে দেখছেন। এরপর আশেপাশের অনেকের কাছে শুনে নিশ্চিত হয়েছেন, আমিই সেই অভিনেতা। তিনি আমাকে বললেন, ‘ভাই আপনি যে প্যান্ট পরতে পারেন তাই তো আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। তারপর আবার জিন্সের প্যান্ট, বুট পরে আছেন।’ আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি। উনি আরও বললেন, ‘খালি আমিই না। আমার এলাকার সব মানুষ মনে করে, আপনি গ্রামে থাকেন শুটিংয়ের সময় আপনাকে ডেকে এনে অভিনয় করানো হয়।’
আরেকবার একজন ভক্ত পরিচয় দিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘আপনি কি জীবনে লেখাপড়া করছেন?’ আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আমি বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স পাস করেছি।’ শুনে উনি বললেন, ‘ও আচ্ছা, তার মানে পড়াশোনা করছেন!’ মেজাজ চেপে রেখে তাকে বলেছিলাম, ‘নিজের সম্পর্কে এর আগে মানুষের মুখে শুনেছি আমাকে চোরের মতো লাগে। লম্পটের মতো লাগে। বদমাইশের মতো লাগে। ডাকাতের মতো লাগে।’ কিন্তু, আমাকে দেখতে যে মূর্খের মতোও লাগে তা ওই প্রথম জানলাম!
ইএইচ/




