স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের অধিকারী স্নিগ্ধা চৌধুরী। মডেলিংয়ে দ্যুতি ছড়ান। গেল রোজার ঈদে নারীকেন্দ্রিক সিনেমা দিয়ে অভিষেক হয়। নারীর সংগ্রাম ও প্রতিবন্ধকতা নিয়েও তার ভাবনার জায়গা শক্তিশালী। সম্প্রতি ঢাকা মেইলের সঙ্গে এ ‘প্রেশার কুকার’ গার্লের ফোনালাপে উঠে এসেছে সেসব।
‘প্রেশার কুকারে’র রেশ কাটল?
‘প্রেশার কুকার’ এত অল্পে রেশ কাটার মতো সিনেমা না। আরও বেশ কিছুদিন থাকবে। মানুষ এখনও দেখতে চায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে না।
প্রথম সিনেমা নিয়ে আপনি কতটা সন্তুষ্ট?
শতভাগ সন্তুষ্ট। প্রথম সিনেমা বলেই যে গৎবাঁধা রোমান্টিক হতে হবে ব্যাপারটা তেমন না। রায়হান রাফীর সঙ্গে আগে একটা সিনেমা হওয়ার কথা ছিল। ওটা হয়নি। কিন্তু আমি সবসময় চাচ্ছিলাম শুরুটা রাফীর সঙ্গে হোক। সেটিই হয়েছে। ছবিটি যদি আলোচিত বা ব্লকবাস্টার হিট না হতো তখন খারাপ লাগা কাজ করত। সেটি যখন হয়েছে কোনো অসন্তোষ বা আক্ষেপ নেই।
ছবিটি কি নারীর প্রতি দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পেরেছে?
বাংলাদেশ এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যেখানে একটি সিনেমা দিয়ে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো সম্ভব না। এখানে এত নারী বিদ্বেষী কথাবার্তা, এত কিছু হয়ে যাচ্ছে! নারী নির্যাতন, ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছেই। এরমধ্যে নিউজ দেখলাম— এক অন্তঃসত্ত্বাকে তার স্বামী পুড়িয়ে মেরেছে। এগুলো একটি ‘প্রেশার কুকার’ দিয়ে বন্ধ হবে বা প্রভাব পড়বে এরকম না বিষয়টা। তবে সিনেমাটির সঙ্গে সব বয়সী নারীরা নিজেদের যুক্ত করতে পেরেছে। ১৮ বছরের মেয়েকে নিয়ে মাকে আসতে দেখেছি। আবার ৫৫ বছরের নারীকেও প্রেক্ষাগৃহে দেখেছি। ৭৫ বছর বয়স্কা নারীরাও এসেছেন। একবার এই বয়সের ২-৩ জন নারীকে দেখি মাত্রই সিনেমাটি দেখে গুলশানের কোনো এক ক্যাফেতে বসেছেন। ওই সময় আমিও সেখানে গেছি। আমাকে দেখে তারা বলছেন— তুমি প্রেশার কুকার গার্ল না? সব বয়স ও শ্রেণির নারীরা ছবিটির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু এই ছবির প্রভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা কমবে সেটি আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আশা করা ভুল।
এই সিনেমার মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির নারীর সংগ্রাম, প্রতিবন্ধকতা কাছে থেকে দেখেছেন। উপলব্ধি কী?
আমি ছোট থেকে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করছি। যেকোনো নারীর ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করি। সে হোক আমার বাসার পারিচারিকা, স্টাফ, বন্ধু, সহশিল্পী কিংবা বোন। চোখের সামনে কোনো নারী ট্রমার ভেতর দিয়ে যাবে এটা সহ্য করতে পারি না। ঈদের দিন সিনেমাটি প্রথম দেখার পর বুঝতে পারি এটা প্রত্যেক নারীকে যুক্ত করতে পারবে। এর আগে স্ক্রিপ্ট পড়ার সময় কিংবা শুটিংয়ের মুহূর্তে বুঝতে পারিনি। আমার ছিল জেনজির ক্যারেক্টার। সেটা নিয়ে স্টাডি করেছি। তখন বুঝেছি প্রতিরাতে এই শহরে কতকিছুর মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়। অনেক ইনফ্লুয়েন্সার আছে যারা সামাজিক মাধ্যমে দেখায় গুলশান-বনানীর লাইফ লিড করছে কিন্তু থাকে হয়তো কালাচাঁদপুর বা মিরপুর। তাদের বিভিন্ন ক্রাইসিসেও পড়তে হয়। আমার চরিত্রটিও সেরকম। নাজিফা তুষি আপুর চরিত্র ছিল ম্যাসাজ পার্লার গার্লের। যেগুলো দেখে মনে হয়েছে বাস্তব গল্পগুলো বলা হয়েছে। যেখানে সবাইকে এই প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
সেদিন দেখলাম নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন…
বিষয়টি আমাকে অনেক ভাবায়। সেজন্যই লিখি। কেননা এরকম সমাজ আমরা প্রত্যাশা করি না। আমরা নারীরা কেন কাজ করি? যেন স্বাধীন ও নিরাপদভাবে চলতে পারি। তাছাড়া একটি পানির বোতলের জন্যও ভ্যাট দিই। অতএব ওই নিরাপত্তাটুকু আমাদের প্রাপ্য।
নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
একটি শিশু যেদিন জন্ম নেয় সেদিন থেকেই তার প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা শুরু। ঘরে আমাকে বাবা-মা নিরাপত্তা দিচ্ছেন। বাইরে বের হওয়ার পর আমি রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ি। আমি নাহয় নিজের ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করছি। যে নারীরা গণপরিবহন অর্থাৎ বাস-ট্রেনে চলাফেরা করেন তাদের কী অবস্থা ভেবে দেখুন! একবার এক তরুণী আমার স্ট্যাটাসের কমেন্টবক্সে লিখেছিলেন, আপনার নিজস্ব ট্রান্সপোর্ট আছে; তবুও এভাবে চিন্তা করেন! আমরা যারা পাবলিক বাসে চলাফেরা করি তাদের কথাটা একবার ভেবে দেখুন। সেদিন রাতে বিষয়টি নিয়ে আসলেই চিন্তা করি। কতটা গভীরভাবে ভেবে সে পাবলিক প্লাটফর্মে এরকম মন্তব্য করেছে! তার প্রোফাইল ঘেটে দেখলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এগুলো রাষ্ট্রের চিন্তা করা উচিত। কেননা বাংলাদেশে নারীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাছাড়া আমার মনে হয় নারীরা শান্তির প্রতীক। আমাদের ধর্মেও বলা আছে। অতএব নারীদের সম্মান দেবে রাষ্ট্র। এটাই রাষ্ট্র বা সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া।
সামাজিক মাধ্যমে নেটিজেনদের নেতিবাচক মন্তব্য কীভাবে নেন?
পড়িই না। সম্প্রতি একটি অ্যাওয়ার্ড নাইটে গিয়েছিলাম। ওরা আমার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানকার ৪-৫টি মন্তব্য পড়েছি। একটিও ইতিবাচক না। এরপর আর পড়িনি। দেশের মানুষের মানসিকতা এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে তাদের মুখ দিয়ে ভালো কিছু বের হওয়া সম্ভব না। সেগুলো পড়ে অসুস্থ হতে চাই না। কেননা আমি ইতিবাচক মানসিকতার। নেতিবাচকতার মধ্যেও ইতিবাচকতা খোঁজার চেষ্টা করি। ওই জায়গা থেকে নেগেটিভ মন্তব্য পড়ে অসুস্থ হওয়ার বা মন খারাপ করার মানে হয় না।
শিল্পী সমিতির নির্বাচন হলো। খেয়াল করেছেন?
আমি এফডিসিভিত্তিক না। সেজন্য এগুলো নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। শুধু দেখেছি নির্বাচন হয়েছে।
ভবিষ্যতে শিল্পী সমিতিতে নির্বাচন করবেন?
না, না। এসব করার কোনো আগ্রহ নাই।
ব্যস্ততার ফিরিস্তি শুনতে চাচ্ছি…
সিনেমা নিয়ে অনেকগুলো মিটিং হলো। তবে ‘প্রেশার কুকারে’র পর আমাকে নিয়ে যেমন দর্শকের প্রত্যাশা বেড়েছে তেমনি নিজেরও বেড়েছে। সব ঠিকঠাক মিললেই কাজে নামব। আপাতত মডলিং নিয়ে ব্যস্ততা যাচ্ছে।
আরআর








