গাইবান্ধার মেয়ে সুরাইয়া তাছনিন সাথী। সেখানেই বাস। পাড়াগাঁয়ে বসেই করেছেন বিশ্বজয়। তার নির্মিত সিনেমা ‘রেশমা: এ স্ট্রাগল ফর আইডেন্টিটি’ জিতেছে কানেক্ট এইচইআর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এ সেরা ছবির পুরস্কার।
গেল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় সাথীর। জানালেন সিনেমা নিয়ে স্বপ্নের শুরু ও বাস্তবায়নের আদ্যোপান্ত। আরও জানালেন ‘রেশমা: এ স্ট্রাগল ফর আইডেন্টিটি’-এর শুটিংয়ের সময় অনেকে ভেবেছিলেন টিকটক করছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
সাথীর জন্ম বেড়ে ওঠা গাইবান্ধার দক্ষিণ কঞ্চিপাড়া গ্রামে। বড় ভাই থিয়েটার করায় ছোটবেলা থেকেই চেনাজানা অভিনয়, স্ক্রিপ্ট প্রভৃতির সঙ্গে। নির্মাণের স্বপ্ন ডানা মেলে সেখান থেকেই। তবে পড়াশোনার ব্যস্ততায় বেশি ভাবার সুযোগ হয়নি তখন। সুযোগ এনে দেয় কানেক্ট এইচইআর-এর বিশেষ ফেলোশিপ ভিত্তিক ফিল্ম ক্লাস।
গেল বছরের ঘটনা। গাইবান্ধা সরকারি কলেজে আয়োজন করা হয় সে কর্মশালার। মেন্টর ছিলেন নভেরা হাসান নিক্বণ। তার থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়েই মাঠে নামেন সাথী।
তার কথায়, ‘বিভিন্ন নারীর ওপর জানার চেষ্টা করছিলাম। যারা সমাজে অবদান রাখছেন এরকম কয়েকজন সম্পর্কে। যাদের একজন ছিলেন সুরাইয়া ফারহানা রেশমা আপা।’
এই নারী উদ্যোক্তার জীবনের সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের লড়াই হয়ে ওঠে সাথীর প্রথম চলচ্চিত্র ‘রেশমা: এ স্ট্রাগল ফর আইডেন্টিটি’-এর বিষয়বস্তু। সিনেমাটোগ্রাফিতে ছিলেন মিঠুন বর্মন ও মারুফ ভুঁইয়া। প্রডাকশন টিমে কাজ করেছেন আবু বকর সিদ্দিক (শুভ আকন্দ), আপন, আরিফ, সুস্মি সরকার ও অর্ঘ্য রায়। কারিগরি সহায়তায় ছিল ধ্রুপদ কমিউনিকেশন।
বিজ্ঞাপন
সাথী সিনেমাটির শুটিং করেন বগুড়ায়। কেননা রেশমার বাড়ি বগুড়া। তিনদিন লাগে দৃশ্যধারণে। তবে এইচএসসির প্রথম বর্ষের মেয়েটি যে সিনেমা বানাচ্ছিলেন চারপাশের লোকজন সেটি বুঝতে পারেননি। ভেবেছিলেন সেও বোধহয় টিকটকার।
সাথীর কথায়, ‘সবাই টিকটক বানায়। চারপাশের সবাই ভেবেছিলেন আমিও টিকটক কিংবা রীলস বানাচ্ছি। তাদের বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছি আমি সিনেমা বানাচ্ছি। কিন্তু তারা বোঝেননি।’
নির্মাণকাজ শেষে সাথী ফের শরণাপন্ন হন নভেরার। তার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সিনেমাটি পাঠান কানেক্ট এইচইআর ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এ। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিন শহরে অনুষ্ঠিত এ ফেস্টিভ্যালের ১৩তম আসরে প্রামাণ্যচিত্র সেরার পুরস্কার অর্জন করে ছবিটি। বিশ্বের ২৬টি দেশের ১৮৪টি চলচ্চিত্রকে পেছনে ফেলে ‘Women & Work’ ক্যাটাগরিতে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতে ‘রেশমা: এ স্ট্রাগল ফর আইডেন্টিটি’।
গত ১ ও ২ মে অস্টিনের স্ট্রিট থিয়েটারে দুই দিনব্যাপী আয়োজিত হয় এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। সমাপনী দিনে বিশ্বব্যাপী নির্মাতাদের উপস্থিতিতে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। তবে সাথী কখনও ভাবেননি পুরস্কারটি তার হবে। তিনি বলেন, ‘যখন অফিশিয়াল সিলেকশন হলো তখন ওটাই আমার কাছে বড় পাওয়া ছিল।আন্তর্জাতিকভাবে যে ওম্যান এন্ড ওয়ার্ক ক্যাটাগরিতে জায়গা পেয়েছে তাতেই খুশি ছিলাম। যখন পুরস্কার ঘোষণা হলো তখন অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করছিল। আশ্চর্য হয়েছিলাম।’
সাথী পুরস্কার প্রাপ্তির খবরে উচ্ছ্বসিত হন আশেপাশের মানুষজনও। তাকে দেখতেও আসেন অনেকে। তবে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল পুরস্কারের আড়াই হাজার ডলার। তরুণ এ নির্মাতা সেরকমই জানালেন।
তিনি বলেন, ‘এ অর্জনের কথা জানার পর অনেকে বাসায় আসেন আমাকে দেখতে। তবে তারা শুধু আমার প্রাইজমানিটা দেখছিলেন। ওটার কথাই বলছিলেন। আমার সিনেমাটা তাদের আলোচনায় ছিল না। তবে আমার নির্মাণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেরা হওয়ায় পরিবারের মানুষজন অনেক খুশি হয়েছেন।’
পুরস্কারের অর্থ এখনও হাতে এসে পৌঁছায়নি সাথীর। জানালেন সময় লাগবে। সিনেমা নির্মাণের কাজেই ব্যয় করতে চান সে টাকা। এইচএসসি পরীক্ষার্থী সাথী বললেন, ‘পরীক্ষার পর আবার শুরু করব। কেননা দায়িত্বটা বেড়ে গেছে। নারীদের ওপরই কাজ করতে চাই।’ পড়ার টেবিলেও চলচ্চিত্র বেছে নিতে আগ্রহী সাথী। জানালেন ফিল্ম মেকিংয়ে স্নাতক করতে চান।
তরুণ এ নির্মাতার অর্জনের খবর উঠে এসেছে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে। সামাজিক মাধ্যমেও আলোচনার বিষয়বস্তু। অনেকেই জানাচ্ছেন অভিনন্দন। তবে নির্মাতা খন্দকার সুমন ছাড়া চলচ্চিত্রাঙ্গনের তেমন কারও থেকে অভিনন্দন পাননি বলে জানালেন তিনি।
আরআর




