রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

শাকিব ভাইয়ের অন্য ছবি হলে এত চিন্তা করতে হতো না: জাহিদ নিরব

রাফিউজ্জামান রাফি
প্রকাশিত: ০৩ মে ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

শাকিব ভাইয়ের অন্য ছবি হলে এত চিন্তা করতে হতো না: জাহিদ নিরব
নিজেকে ভাঙচুরের এই পর্যায়ে শাকিব খান পর্দায় আসছেন রকস্টারের ভূমিকায়। কর্মযজ্ঞের কোথাও কমতি রাখছেন না পরিচালক আজমান রুশো। সঠিক মেধা খাটাচ্ছেন সঠিক জায়গায়। তারই ধারাবাহিকতায় রকস্টারের গান ও আবহ সংগীতের দায়িত্ব কাঁধে পড়েছে জাহিদ নিরবের। সেসব অভিজ্ঞতা ঢাকা মেইলের সঙ্গে ভাগ করতে গিয়ে মনের আগল খুলেছেন এ জনপ্রিয় সুরকার-সংগীত পরিচালক।

‘রকস্টার’-এ যুক্ত হওয়ার গল্প শুনতে চাই। 


বিজ্ঞাপন


আজমান রুশো ভাইয়ের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ওনার অনেক বিজ্ঞাপনের মিউজিক করেছি। গত বছরের শেষের দিকে একদিন ফোন করে অফিসে ডাকলেন। ‘রকস্টার’-এর কথা জানালেন। বললেন মেগাস্টার শাকিব খান থাকছেন। একটু আশ্চর্য হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল এরকম অনেকেই বলে। এটা বোধহয় হবে না। পরে দেখলাম বিষয়টি সিরিয়াস। বড় একটা কাজ। প্রক্রিয়াটা লম্বা ছিল। অনেকদিনের পরিকল্পনা। রুশো ভাই ও আহমেদ হাসান সানি ভাই দীর্ঘদিন ধরে বসছিলেন। গান বানাচ্ছিলেন। এরপর আমি যুক্ত হই। 

কাজটি করতে গিয়ে চাপ বোধ করছেন কী? 

বিজিএমের ক্ষেত্রে এটা আমার সপ্তম সিনেমা। এরমধ্যে অনেকগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ‘পরাণ’, ‘উৎসব’, ‘বনলতা এক্সপ্রেসে’র কথা বলতে পারি। তাছাড়া ঈদের সিনেমা ‘প্রেশার কুকারে’ আমার করা ‘বড়াই করে’ গানটি বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে ‘রকস্টারে’র ব্যাপারটা আলাদা। একটি সিনেমার অ্যানাউন্সমেন্ট টিজার আসতেই আপনি আমার সাথে কথা বলছেন। তার মানে অবশ্যই অন্য কাজগুলোর চেয়ে ভিন্ন। ওই জায়গা থেকে একটা চাপ ছিল। 

nirb


বিজ্ঞাপন


আর কোনো চাপ? 

কেউ যদি শোনেন রকস্টার নিয়ে সিনেমা হচ্ছে তারা ভাববেন দেশের সেরা মিউজিশিয়ানদের। যারা ২০-৩০ বছর ধরে নিজেদের প্রমাণ করে আসছেন। কাজটি তাদের পাওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করবেন। ওই জায়গায় আমি নতুন মানুষ যার হিট রক গান কিংবা ওই লেভেলের কাজ নেই। তাই আমার যুক্ত হওয়াটা অনেকে ভালোভাবে নেবেন না। সন্দিহান থাকবেন। বিষয়গুলো মাথায় রেখে ভাবছিলাম— কী করা যায়। শেষে সংগীতাঙ্গনের আসল রকস্টার যেমন লিজেন্ডারি বেজিস্ট তানিম ভাই, নেমেসিস ব্যান্ডের গিটারিস্ট ইফাজ ভাই, বাগধারার তওকির তাজাম্মুল, আমাদের তামজিদ সামিউল মমিথ— অর্থাৎ দেশের সেরা মিউজিশিয়ানদের যুক্ত করি। চিন্তা করছিলাম গল্পের সঙ্গে যায় এমন মিউজিক বানাতে হবে। যেখানে রকস্টারের জার্নিটা তার মিউজিকের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে। আরও খোলাসা করে বললে একটি ব্যান্ড কিংবা একজন আর্টিস্ট যেভাবে বেড়ে ওঠে, তার চিন্তাভাবনা যেমন থাকে এই বিষয়গুলো তুলে ধরা। যেমন আমাদের প্রথম দিককার গান খুবই বেসিক কর্ড ও বেসিক অ্যারেঞ্জমেন্টের। আস্তে আস্তে আর্টিস্ট প্রফেশনাল লেভেলে যায় আমরা প্রফেশনালি মিউজিকটাকে আরও সমৃদ্ধ করতে থাকি। গল্পের ভাঙাগড়ার সঙ্গে মিলিয়ে গানের ধরণ বদলায়। রকস্টার মানে যে সব গানই রক তা না। আর্টিস্টের উত্থান পতন মিলিয়ে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। 

আপনি মিউজিশিয়ান। সিনেমাটির গল্পও মিউজিশিয়ানের। আলাদা অনুভূতি কাজ করছে? 

নিজেকে ভাগ্যবান বলব। কেননা শাকিব ভাইয়ের অন্য কোনো ছবি আমার কাছে এলে হয়তো এভাবে চিন্তা করতে হতো না। এই ছবিতে আমাকে প্রমাণ করার সুযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলছি— শাকিব ভাইয়ের ছোটবেলার দৃশ্যে একটি মিউজিক্যাল টার্ম ইউজ করেছি। ড্যাডগ্যাড গিটারের টিউনিং। এই যে একটি নতুন জিনিসের সংযোজন করা গেল— ‘রকস্টার’ সিনেমা হচ্ছে বলে পেরেছি। অ্যাকশনধর্মী সিনেমা হলে পারতাম না। এরকম আরও অনেক কিছু এখান আছে যেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সিনেমার চেয়ে সংগীতের দিক থেকে কতটা সঠিক ও সমৃদ্ধ— চিন্তা করতে হয়েছে। 

শাকিবিয়ানদের উন্মদনা কেমন উপভোগ করছেন? 

একটা ঘটনা বলি। গত পরশু ফেসবুকে বিজ্ঞাপনের একটা স্টোরি দিয়েছিলাম। বিজ্ঞাপনটা বানানোর সময় নির্মাতা মার্টিন গ্যারিক্সের একটি সাউন্ড শোনান। ওই সাউন্ডটা বাজিয়ে স্টোরি দিই। অনেকে ভাবলেন এটা ‘রকস্টার’ সিনেমার মিউজিক। তাদের কেউ বললেন মার্টিনের কপি মিউজিক। অথচ আমি কিন্তু ওখানে একবারও বলিনি এটা ‘রকস্টার’-এর কিছু। বিষয়টা নেতিবাচকভাবে নিচ্ছি না। কেননা কোনো মিউজিক মিলে গেলে এবং সেটা নিয়ে কথা হলে ইতিবাচকভাবে দেখি। কারণ সিনসিয়ার অডিয়েন্সের সংখ্যা বাড়ছে। এটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভালো।  

656209916_1489903665836337_6065746060110465558_n_(1)

শাকিবিয়ানদের উন্মাদনা কখনও বিড়ম্বনা মনে হচ্ছে কী? 

না। একটা সিনেমা রিলিজের আগেই অডিয়েন্স এত উত্তেজিত! এটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে ভয়ের জায়গা আছে। কেননা আমি এমন কিছু বানাতে পারব না যা আগে শুনিনি। জীবনে যা কিছু শুনেছি সেখান থেকেই বানাব। সেক্ষেত্রে যদি মনের অজান্তেও কিছু মিলে যায় তবে তারা ব্যথিত হবেন। এটা একটা ভয়। আরও একটি ভয়ের জায়গা আছে। উদাহরণ দিচ্ছি। ‘জাওয়ান’ সিনেমার মিউজিক অনেকের পছন্দ হয়েছিল। ছবিটি মুক্তির পর দুজন পরিচালক আসেন আমার কাছে। একজন চাইলেন ‘জাওয়ান’ -এর মতো মিউজিক। অন্যজন বললেন কোনোভাবেই ‘জাওয়ান’-এর মতো হওয়া যাবে না। তার মানে একেকজনের চিন্তা একেকরকম। ওই জায়গা থেকে দেখা যায় দর্শক-শ্রোতাদের একটি অংশ ভাবছেন দুঃখের দৃশ্যে বিজিএম করে উড়িয়ে দিতে হবে। অন্য অংশ ভাবছেন মিউজিক থাকারই দরকার নেই। ওখানে অভিনয়ই যথেষ্ট। কোনোটাই কিন্তু ভুল না। একেকজনের উপলব্ধি একেকরকম। এটাই ভয়। 

সিনেমাটিতে শাকিবের জায়গায় যদি অন্য কেউ থাকলে তখনও কী আয়োজনের এই মহাযজ্ঞ থাকত? 

অবশ্যই থাকত। আমার প্রত্যেক কাজেই চাইব বেস্ট আউটপুট দিতে। ওই জায়গা থেকে গল্প যদি এটা থাকত মিউজিশিয়ান যদি এরকম ডিমান্ড করত অবশ্যই ব্যবহার করতাম। খেয়াল করলে দেখবেন ঈদে আমার একটা প্রজেক্ট ছিল। ওখানে আমি পাঁচ-ছয় জনকে নিয়ে তালি রেকর্ড করেছি। এরকম তালির হাজার হাজার স্যাম্পল পাওয়া যায়। চার-পাঁচজন লোক দিয়ে রেকর্ড করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আমি প্রয়োজন বোধ করেছি। এটা মিউজিক্যাল অনেস্টি। আমি আমার স্যাম্পল, অডিও, সাউন্ড রেকর্ড করে প্রডিউস করছি। এটা আমার আর্টিস্টিক ডিগনিটির জায়গা। আবার দেখবেন বড়াই করে গানে একটা লেয়ার আছে যেখানে এআই ব্যবহার করেছি। সব মিলিয়ে মিউজিকের ক্ষেত্রে আমার যেটা শুনতে ভালো লাগবে সেটা ব্যবহার করব। 

শাকিব খান আপনার স্টুডিওতে এসেছিলেন। শুটিং করেছেন। ওনাকে নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? 

২০১১ সালে একটি প্রতিযোগিতায় ছিলাম। এফডিসির নয় নাম্বার ফ্লোরে আমাদের শুটিং চলছিল। দোতলায় মেকআপ রুমের ওখান দিয়ে একটা দল যাচ্ছিল। শাকিব খান ছিলেন কেন্দ্রে। মনে হচ্ছিল উনি হাঁটছেন, পেছনে পুরো এফডিসি হাঁটছে। ওনার মধ্যে ওই অরাটা কাজ করে। এখানে (জাহিদ নিরবের স্টুডিওতে) যখন এলেন দেখলাম খুবই আন্তরিক। প্রায় তিন-চার ঘণ্টা ছিলেন। এরমধ্যে দুই ঘণ্টার মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমরা কীভাবে গিটার, পিয়ানো বাজাচ্ছি— অবজার্ভ করছিলেন। উনি ক্যারিয়ারের যে জায়গায় আছেন সেখানে থেকেও এরকম ডেডিকেশন আমাকে ভাবিয়েছে। বুঝতে পেরেছি এজন্যই উনি ওই জায়গায়। তাছাড়া উনি যে এত বড় সেলিব্রেটি সেটা বুঝতেই দেননি। মনে হয়েছে আমাদেরই একজন। 

JAHID-NIROB_20251019_184846735

সিনেমাটির গান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোন দিকগুলো প্রাধান্য পেয়েছে? 

গানগুলোর প্রাথমিক বাছাইতে ছিলেন রুশো-সানি ভাই। আমি যুক্ত হই গান বানানোর প্রক্রিয়া থেকে। তখন তিনজন মিলে কাজটি করেছি। কোনো গান শুনে মনে হয়েছে এটা ছবির অন্য জায়গায় থাকতে পারে। কোনোটা শুনে মনে হয়েছে এরকম না হয়ে অন্যরকম হতে পারে। বিষয়গুলো বসে ঠিক করেছি। তবে প্রাধান্য পেয়েছে গল্প। গল্পের জন্য যে লিরিক-টিউন যায় সেটাই রেখেছি। 

অ্যানাউন্সমেন্ট টিজার প্রকাশ পেতেই দারুণ সাড়া। কেমন বোধ করছেন? 

অ্যানিমেশন করেছেন মোরশেদ মিশু ভাই। উনি খুবই ট্যালেন্টেড। সিনেমার ফার্স্ট প্রমোশন এরকম হতে পারে আমাদের এখানে বোধহয় এটাই প্রথম। বেশ মজা লাগছে। কারণ এত দ্রুত এত ফিডব্যাক কখনও পাওয়া হয়নি। কিন্তু আমার চিন্তার হচ্ছে পরের মিউজিক যেন এরচেয়ে ভালো হয়। কোনোভাবেই যেন পিছিয়ে না পড়ি। 

‘রকস্টার’ নিয়ে কতটা আশাবাদী? 

তার চেয়ে বড় কথা হলো প্রজেক্টটা যেন ঠিকঠাক শেষ করতে পারি। সেই দোয়া করছি। বাংলাদেশের সেরা মিউজিক হওয়ার দরকার নেই। নিজের জায়গা থেকে সেরাটা দিতে পারলেই শান্তি পাব। 

IMG_1280_20251019_185353003

‘রকস্টার’ বাদে ব্যস্ততা কী নিয়ে?

‘রকস্টার’ করতেই তো জান শেষ! আর কিছু করছি না। নতুন করে কোনো কাজ নিচ্ছিও না। সময়টা ভালোভাবে ইউটিলাইজ করতে চাচ্ছি। 

আরআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর