মফস্বলের ঘ্রাণ গায়ে মাখা ছেলেটি মেয়েদের দিকে তাকাতে অস্বস্তি বোধ করত। একদিন এক তরুণী সাহসী করে তোলে তাকে। সংকোচ ভুলে ছেলেটি দুই দুইবার চোখ তুলে দেখে মেয়েটিকে ।
গল্পটি এক দশক আগের। এক বন্ধুর ফেয়ারওয়েল পার্টিতে দেখা হয়েছিল তাদের। প্রথম পরিচয়েই বন্ধুত্ব। দীর্ঘ এক দশক পর প্রেমের অধ্যায়ের পৃষ্ঠা খোলেন তারা। মাত্র ৩৮ দিন ভালোবাসার ঘরের নামতা পড়ে গেল বছরের ২৩ অক্টোবর শুরু করেন জীবনের নতুন অধ্যায়। বলছিলাম জনপ্রিয় সুরকার ও সংগীত পরিচালক জাহিদ নিরব এবং তার স্ত্রী সূচনা তাসমিনের ভালোবাসার গল্প।। বিয়ের পর পর সে গল্প ঢাকা মেইলের সঙ্গে ভাগ করেছিলেন জাহিদ নিরব। ভালোবাসা দিবসের আয়োজনে তা প্রকাশ করা হলো।
বিজ্ঞাপন
চলুন তার মুখ থেকেই শোনা যাক, ‘১১ বছর আগে সূচনার সঙ্গে এক ফ্রেন্ডের ফেয়ারওয়েল পার্টিতে দেখা হয়। দুজনেরই মিউচুয়াল ফ্রেন্ড ছিল সে। অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছিল। ওই উপলক্ষে সবাই এক হয়েছিলাম। ওখানেই আমাদের প্রথম পরিচয় ও বন্ধুত্ব। পরে জানলাম আমরা পাশাপাশি এলাকায় থাকি। এরপর একদিন আমাকে রেস্টুরেন্টে ডাকল। গেলাম। ভালো লাগল।’

শুরুতেই সূচনার সৌন্দর্যে হৃদয় ঝলসে যায় নিরবের। মফস্বল থেকে উঠে আসা ছেলেটিকে সাহসী করে তোলে সে সৌন্দর্য। এমনটা জানিয়ে বললেন, ‘ও অনেক সুন্দর ছিল। আর সুন্দরের প্রতি তো সবার দুর্বলতা থাকে। আমি সাধারণত মেয়েদের দিকে তাকাতাম না। মফস্বল থেকে এসেছি। অস্বস্তি বোধ করতাম। কিন্তু ওর দিকে দুই বার তাকিয়েছিলাম। ভাবছিলাম, ইশ্ , এত সুন্দর কেন!’
তখনও ভালোবাসা বা প্রেমের আনাগোনা ছিল না। সম্পর্ক হাঁটছিল বন্ধুত্বের মোড়কে। নিরব একটি এফএম রেডিও স্টেশনে কাজ করতেন। সেখানে মাঝেসাঝে ঢুঁ মারতেন সূচনা। জাহিদ নিরবের কথায়, ‘‘আমি তখন একটি এফএম রেডিওতে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করি। বিভিন্ন ব্যান্ডে গেস্ট মেম্বার হিসেবে বাজাই। একদিন হঠাৎ ও ফোন দিয়ে বলল, তুমি কি রেডিওতে আছ? আমি আসছি। এরপর থেকে মাঝে মাঝে আসত। গুলশান কিংবা আশেপাশে এলে নক দিত। ও যখন আসত তখন রেডিওর সবাই আমার রুমে হাজির হতো। আমাদের নিয়ে কানাঘুষা চলত। ওই সময় আমি ওকে ‘আয়নাবাজি’ সিনেমার প্রিমিয়ারে ইনভাইট করি। আপনি জানেন আমরা ওই ছবিতে কাজ করেছিলাম। সূচনাকে বললাম, আমি যাচ্ছি তুমি যেতে পার। আমি ও চিরকুটের সঙ্গে সূচনাও যায়।’’
বিজ্ঞাপন
সম্পর্ক বন্ধুত্বের হাত ধরে হাঁটলেও নিরবের ভেতর ধীরে ধীরে সরব হচ্ছিল প্রেম। ভালোবাসার প্রজাপতিকে আশকারা দিয়েছিল সূচনার ভেতরকার কিছু গুণ। তিনি বলেন, ‘ও খুব ঠান্ডা স্বভাবের। মাদারলি আচরণ। ওই জায়গা থেকে একটা দুর্বলতা তৈরি হচ্ছিল। ২০১৮ সালে প্রথম মনে হলো আমি ওকে কিছু বলতে চাই। জানতে চাই আমাদের মধ্যে এর চেয়ে বেশি কিছু হবে কি না? কিন্তু তার আগেই কোনো এক কারণে আমি ওর সাথে রাগ করি। প্রত্যুত্তর স্বরূপ ও আমাকে ব্লক করে দেয়।’

লঘু পাপের সে গুরুদণ্ড নিরবকে বয়ে বেড়াতে হয় অর্ধযুগ। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালে ব্লক করেছিল। আনব্লক করে ২০২৪ সালে। অর্থাৎ এক ব্লকে ৬ বছর! এরমধ্যে আমাদের কথা হয়নি। কেননা কোথাও এক্সেস ছিল না আমার। ফোন নাম্বার পর্যন্ত বদলেছিল। অর্থাৎ আমাকে একেবারে নেটওয়ার্কের বাইরে রেখেছিল। তবে ঠিকই খোঁজ রাখতাম। আমাদের দুজনের মিউচুয়াল ফ্রেন্ড অনেক ছিল। ও কোথায় যায়, কী করে— খবর পেতাম।’
অতঃপর ছয় বছর পর মান ভাঙে কন্যার। নিরব বলেন, ‘ও শুধু মেইলটা খোলা রেখেছিল। ওই কয়েক বছর মেইল করেছি। মাঝে মাঝে রিপ্লাই আসত। ২০২৪ সালে শেষ মেইলে বললাম, আর কত ব্লক করে রাখবা। এরপর দেখলাম ইনস্টাগ্রামে রিকোয়েস্ট এসেছে।’
তবে সূচনা দুয়ার খুললেও চৌকাঠ মাড়াতে ভয় ছিল নিরবের। অনেক সাধনায় ফিরে পাওয়া সম্পর্কের প্রতি আরও সাবধানী হয়ে পড়েন। তাই ভালোবাসি কথাটিও আর বলা হয়নি। তার কথায়, ‘ওকে কখনও প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। আমার যে একটা দুর্বলতা আছে সেটিও প্রকাশ করিনি। আর আনব্লক করার পর ওর সাথে কথা বলতাম কম। নকও কম দিতাম। আর যেন সম্পর্কটা নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল বেশি রাখতাম।’

এবার যেন সূচনাই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। নিরবের কথায়, ‘কয়েকদিন আগে কাজী নজরুল ইসলামের একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম। ওখানে ওকে দাওয়াত দিলাম। ও এলো। দেখা করলাম। বেশি কথা বললাম না। হাই-হ্যালো করে ওকে বসালাম। অল্প কিছুক্ষণ ছিল। কয়েকটা গান শুনে চলে গেল। এরপর থেকে খুব কম কথা হতো।’
এবার ৩৮ দিনের গল্পে ঢুকলেন নিরব। বললেন, ‘৩৮ দিন আগে ওকে দেখা করতে বলি। এরপর রেস্টুরেন্টে দুই-তিনবার দেখা হয়। তখন ওর দিক থেকে সবুজ সংকেত পাচ্ছিলাম। একসময় ও-ই বলে, অনেক বছর হয়ে গেল, চলো সম্পর্কটা আরও একটু সুন্দর করি। এরপর আর সময় নেইনি।’
সময় নেননি ভালো কথা। নীরবে বিয়ে করলেন কেন? প্রশ্ন ছুড়ে দিলে সংগীত পরিচালক বললেন, ‘আমার সার্কেলটা বড়। বড় করে অনুষ্ঠান করব। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা ছিল বিয়ের পর ওমরায় যাওয়ার। সূচনাও চাচ্ছিল বিয়েটা করে আগে ওমরাহ করি। পরে সবাইকে জানাই। সে কারণেই।’

ওমরাহর সময়টা ভাগ করতে অনুরোধ করতেই বললেন, ‘আমি আগে ওমরাহ করেছি। সূচনাও একাধিকবার হজ-ওমরাহ করেছে। ফলে দুজনের আলাপের বড় একটা অংশ ছিল হজ-ওমরা। তাছাড়া মানুষ হানিমুনে দেশের বাইরে গেলে যেটা হয় সেটা তো মক্কায়ও সম্ভব। অর্থাৎ নিজেদের মতো করে সময় কাটানোটা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওমরাহ। তাছাড়া বিয়ের পরদিনই হেরেম শরীফে গিয়ে দোয়া, একসঙ্গে নামাজ পড়া আমার কাছে অনেক আলাদা ও পবিত্র মনে হয়েছে। তায়েফে গেছি, ঘুরেছি। খুব ঠান্ডা ছিল। মদিনায় গেছি, জেদ্দায় ঘুরেছি। ওখানে বিচও ছিল। সবমিলিয়ে এটা একটা দারুণ ভ্রমণ ছিল।’
বিয়ে পরবর্তী সময় নিরব যেন তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছেন। কথায়ই বোঝা গেল। বললেন, ‘খুব এনজয় করছি। অফিসকেও বলেছি সময়টা নিজের মতো করে কাটাতে চাই। ছুটিতে আছি। আমার বিশ্বাস, সূচনাও এনজয় করছে।’
নিরবের স্ত্রী আইনের ছাত্রী। যৌথ জীবনে কদিনে কী কী আইন-কানুন শেখা হলো— জানতে চাইলে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমিও আইন নিয়ে পড়েছি। প্যানেল কোড, পুলিশ ল– এগুলো আমরা আগেই জানতাম। এরমধ্যে নতুন কিছু শিখিনি। তবে একটু রুটিনে চলতে হচ্ছে।’

অনেকে আছেন বিয়ের পর ফেলে আসা একলা জীবন, অবাধ স্বাধীনতার অভাব বোধ করেন। তবে নিরবের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তার কথায়, ‘আমি একটু অন্যভাবে ভাবি। অতীত নিয়ে মিস করার বিষয়টি কাজ করে না। ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন হই না। সবসময় বর্তমান থেকে শুরু করতে চাই। তবে পেছনের স্মৃতিগুলো অনুপ্রাণিত করে।’
গানের মানুষের হাত ধরা সূচনা সংগীতের প্রতি কতটা অনুরাগী— জানতে চাইলে নিরব বললেন, ‘ওর মিউজিক সেন্স খুব ভালো। আমাকেও খুব উৎসাহ দিত। বিভিন্ন গানের রেফারেন্স দিত, শোনাত। বলত এরকম গান বানাও। আগে থেকেই শেয়ারিং ছিল আমাদের মধ্যে।’
শুধু অনুপ্রেরণাতেই সীমাবদ্ধ না। কাছের মানুষের সমালোচনা করতেও ছাড়েন না সূচনা। নিরবের কথায়, ‘একদম সরল মনে স্বাভাবিকভাবে সমালোচনা করে। ধরুন কোনো একটা নতুন কাজ নিয়ে আমি খুবই এক্সাইটেড। কিন্তু ও সেখানে শক্ত সমালোচকের মতো বলে, এটা যাচ্ছে না, ওটা হচ্ছে না। খুব সরল মনে। তবে এটা খুবই দরকার। ওর প্লে লিস্ট অনেক সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। পুরনো দিন থেকে শুরু করে আজকের মিউজিক– সব শোনে।’

শিল্পী সময়ের ধার ধারে না। অগোছালোভাবে নিজেকে গুছিয়ে রাখে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিকই বটে। তবে ম্যানেজ করে নিলে কিংবা সময় অযথা ব্যায় না করে কাজ পরিবারের পেছনে ব্যয় করলে সব দিকই সামলানো যায় বলে মনে করেন জাহিদ নিরব।
ভালোবাসার গল্প বলতে বলতে সংগীত পরিচালক জানালেন দুজনের প্রেমের গল্প নিয়ে সিনেমা বানাবেন তিনি। কেননা সেই পথচলা ধরে রাখতে চান। এরইমধ্যে চিত্রনাট্য লিখেছেন। কথা হচ্ছে প্রযোজনা সংস্থাগুলোর সঙ্গে। ব্যাটে-বলে মিলে গেলেই জ্বলে উঠবে লাইট-ক্যামেরা। আমরা সে ছবি দেখার অপেক্ষায়।
আরআর

