সদ্য ঘোষিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩-এর সেরা সংলাপ রচিয়তা সৈয়দ নাজিম উদ দৌলা। ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার জন্য এ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি উদ্যমী করে তুললেও নাজিমের বেলায় সেটি হচ্ছে না। কেননা চিত্রনাট্য লেখা ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। তাই পুরস্কার আপ্লুত করলেও সিনেমার সংলাপ লিখতে আর কীবোর্ডে আঙুল ঠোকাঠুকি করবে না বলে জানালেন।
নাজিমের স্ক্রিপ্ট রাইটিং ছাড়ার গল্প তুললে প্রায় বছর খানেক পেছনে যেতে হবে। গেল বছরের সেপ্টেম্বরে এক দীর্ঘ পোস্টে নিজের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন তিনি। সম্মানী ও সম্মান না পাওয়ার কারণে স্ক্রিপ্ট রাইটিং ছাড়ছেন বলে জানিয়েছিলেন।
বিজ্ঞাপন

এর প্রায় এক বছর পর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকায় নিজের নাম দেখে আনন্দিত নাজিম। ঢাকা মেইলকে বললেন, ‘কল্পনাও করিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাব। এত বড় স্বীকৃতি যে কারও জন্য আনন্দের। আমার ক্ষেত্রেও তাই। পেয়ে খুব ভালো লাগছে।’
ভালো লাগলেও নাজিম আর ফিরছেন না স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ে। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে চিত্রনাট্য লিখতে এসেছিলেন। কাজও করছিলেন দুহাত খুলে। কিন্তু স্বপ্নের জায়গা দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দিতে সময় নেয়নি। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে লিখছি। স্বপ্ন ছিল অনেক। শুরুতে শখের বসে লিখলেও একসময় পেশা হয়ে যায়। শেষ দুই বছর পেশাদার স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে কাজ করি। কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তি মিলছিল না। সম্মানী পেতাম না ঠিকমতো, কেউ কেউ নামটুকুও দিতে কার্পণ্য করত। আস্তে আস্তে ক্ষোভ জমতে জমতে গেল বছর বিস্ফোরণ ঘটে। সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে চিত্রনাট্য লেখা ছাড়ি।’

বিজ্ঞাপন
বঞ্চনার গল্প তুলে ধরে বলেন, ‘ধরুন, ৩-৪ কোটির বাজেটের একটি সিনেমায় কাজ করলাম। মুক্তির পর বেশ ব্যবসা করল। পরিচালক-প্রযোজকের পকেট ভরল। কিন্তু আমার সামান্য পাওনা পরিশোধ করা হতো না। চাইতে গেলেই শোনাত— লাভ হয়নি, লোকসানে আছে। কিন্তু আমি তো বুঝি। মূল কথা হচ্ছে, সবার পারিশ্রমিকে সমস্যা না হলেও চিত্রনাট্যকারের বেলায় এসে লাভ-লোকসানসহ বিভিন্ন অজুহাত দাঁড়িয়ে যায়। এছাড়া অনেকে ঘোরান। শেষ পর্যন্ত দেন না। এখনও অনেকের কাছে পারিশ্রমিক পাই। যারা দেবেন কি না জানি না।’
কয়েক বছর চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করে নাজিমের উপলব্ধি, ভালো লিখলেই এখানে টিকে থাকা যায় না। পটু হতে হয় আরও বিভিন্ন দিকে। সেসব ঠিক থাকলে লেখাটা গড়পড়তা হলেও চলে। অথচ লেখায় ভালো হলেও অন্যান্য দিকে গড়পড়তা ছিলেন নাজিম। তিনি বলেন, ‘শুধু ভালো লিখলেই হয় না। আরও অনেক কিছু ভালো জানতে হয়। এই যেমন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া, আড্ডায় যাওয়া, সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। এগুলোতে ভালো করলে লেখায় খারাপ হলেও চালিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু এসবে আমি ভালো ছিলাম না। বরং লেখাতেই মনযোগী ছিলাম। একটা উদাহরণ দেই। একবার এক পরিচালক টেলিভিশনে কনটেন্ট নিয়ে কথা বললেও আমার নাম বললেন না। কারণ জানতে চাইলে বললেন, আমি যোগাযোগ রাখি না। আসা যাওয়া নাই। আমার নাম মনে থাকবে কীভাবে!’
সবশেষে জানালেন অতীতে বেশ কয়েকবার বিক্ষিপ্ত হয়ে চিত্রনাট্য লেখার কাজ ছাড়তে চাইলেও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যে আর সরতে পারেননি। স্ত্রীর কথা, ‘নাজিম সিনেমা ছাড়তে চাইলেও সিনেমা তাকে ছাড়ে না।’ এবারও যখন স্ক্রিপ্ট, ডায়লগ লেখা থেকে দূরে ঠিক তখন হাতে এলো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। আবারও কি ফিরবেন নাজিম?

জানালেন, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে ফের ভেতরে উদ্দীপনা ফিরে পাচ্ছেন। তবুও ফিরবেন না। কেননা রূঢ় বাস্তবতা তার জানা। বলেন, ‘এখন আমার একটি প্রতিষ্ঠান আছে। আমার অধীনে কয়েকজন কাজ করে। স্ত্রী-সন্তান আছে। সংসারের খরচ বেড়েছে। তাই চাইলেই অনিশ্চয়তার জীবন বেছে নিতে পারি না। মন চাইলেও বাস্তবতার কারণে স্বপ্নকে প্রশ্রয় দিতে চাই না। তবে সম্পর্কের খাতিরে হয়তো টুকটাক কাজ করা হবে কিন্তু পেশাদারভাবে আর না।’
দেশের প্রথম সারির স্ক্রিপ্ট রাইটারদের একজন নাজিম। লিখেছেন সফল সব সিনেমা, ওয়েব কনটেন্টের স্ক্রিপ্ট, গল্প। তার কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শান’, ‘অপারেশন সুন্দরবন’, ‘দামাল’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘দ্য সাইলেন্স’, ‘বুকের মধ্যে আগুন’, ‘টিকিট’ প্রভৃতি।
আরআর

