সোনালী সময়ের জনপ্রিয় নায়ক ইলিয়াস জাভেদ আর নেই— আজ সোমবার খবরটি ছড়াতেই মৃদু রোদের রাজত্ব ফিকে করে শোকের কুয়াশায় ঢাকল ঢালিউড। সামাজিক মাধ্যম পরিণত হলো শোক বইয়ে।
ইলিয়াস জাভেদ নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাজপুত্রের মতো অবয়ব। চেহারার মতো পরিপাটি পোশাকেও আভিজাত্য ও চাকচিক্যের মিশেল। তবে তার আড়ালে রয়েছে নায়ক হওয়ার টানে জন্মভূমি ও মা-বাবা, ভাই-বোন ছেড়ে আসার গল্প।
বিজ্ঞাপন
১৯৫০ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে জন্মগ্রহণ করেন জাভেদ। আসল নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। বাবা চৌধুরী মোহাম্মদ আফজাল। মা আনোয়ারা বেগম। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে জাভেদ ছিলেন সবার বড়। বাবা চাইতেন ছেলে ব্যবসা করুক। কিন্তু জাভেদের মন কেড়েছিল সিনেমা। নায়ক হওয়ার স্বপ্নে ছিলেন বিভোর।
ওই স্বপ্ন বুকে নিয়েই একদিন ঘর ছাড়েন। বলে রাখা ভালো এর আগে পেশোয়ার থেকে পাঞ্জাবে থিতু হয় জাভেদেরর পরিবার। সেখানে তার সঙ্গে পরিচয় হয় সাধু মহারাজ নামের এক নাচের গুরুর। তার-ই হাত ধরে ১৯৬২ সালে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ)।
বিজ্ঞাপন
ঢাকায় এসে জাভেদ ওঠেন এক বোনের বাসায়। পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজারের পাড়া মহল্লায় কাটতে থাকে তার দিন। দেখতে রাজপুত্রের মতো ছিলেন জাভেদ। তাই অচেনারাও জড়িয়ে নিতেন স্নেহ ও ভালোবাসায়। কেউ কেউ ছেলে বলেও ডাকতেন। এই সৌন্দর্যই তাকে জুটিয়ে দেয় সিনেমার প্রযোজক।
সে ১৯৬৪ সালের কথা। জাভেদের সৌন্দর্যে মুগ্ধদের একজন ছিলেন উত্তরার সুলতান চেয়ারম্যান। জাভেদকে নিয়ে তিনি ‘নায়ি জিন্দেগি’ নামের একটি উর্দু সিনেমায় লগ্নি করেন তিনি। নায়িকা ছিলেন নাসিমা খান। তবে সে ছবি আলোর মুখ দেখেনি।
‘নয়া জিন্দেগি’ র মুক্তি আটকে গেলেও জাভেদের নায়ক হওয়া আটকায়নি। ১৯৬৬ সালে ‘পায়েল’ নামের এক সিনেমায় নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। নায়িকা হিসেবে পান শাবানাকে। ওই ছবির নায়ক ছিলেন রাজ্জাকও। মুক্তির পর দর্শক লুফে নেন ছবিটি। নায়ক হিসেবে জাভেদেরও শক্ত হয় পায়ের তলার মাটি।
জনপ্রিয়তার পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে জাভেদ খেয়াল করেন এদেশের মাটি-মানুষের প্রতি বড্ড টান জন্মেছে তার। সে টান ছেড়ে আর ঘরের ছেলের ঘরে ফেরা হয়নি। বছর তিনেক আগে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাভেদ বলেছিলেন, ‘বাবা-মা, ভাইবোনদের মনে পড়ত। কিন্তু নায়ক হওয়ার নেশা, এই দেশ ও দেশের মানুষ আমাকে এত আকৃষ্ট করেছিল যে ফিরে যেতে ইচ্ছে করত না। আমার কোনো আফসোসও ছিল না এ নিয়ে। আজও নেই।
তবে ভাইয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। দেখা হয়েছিল মায়ের সঙ্গেও। উল্লেখ করে বলেছিলেন, ভাইয়েরা ফোনে যোগাযোগ করে। কিছুদিন আগে এসে দেখে গেছে দুই ভাইয়ের দুই ছেলে। মায়ের কথা মনে পড়ে। দেখা হয়েছিল অনেক আগে। একটা যৌথ প্রযোজনার ছবি করতে পাকিস্তান গিয়েছিলেন। একফাঁকে মায়ের সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন।

যে মাটির টানে ছেড়েছিলেন স্বজন আজ সোমবার বেলা ১১টায় সে মাটিতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। পেছনে রেখে গেলেন অগণিত মানুষের ভালোবাসা আর অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা।
আরআর

