বছর চারেক আগে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে (আইইউবি) এক কনসার্টের মাধ্যমে একজোড়া তরুণ-তরুণীর পরিচয় হয়। ছেলেটি সে কনসার্টে গাইতে গিয়েছিল। মেয়েটি কাজ করত ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে। সুবিধা বঞ্চিত বাচ্চাদের পড়াত। বিষয়গুলো আগ্রহী করে তোলে ছেলেটিকে। সে খেয়াল করে মানুষ হিসেবেও মেয়েটি ভালো। খুব সাধারণ। মুগ্ধতার মাত্রা বাড়ে।
কাছে আসার গল্প এভাবেই শুরু হয়েছিল শিরোনামহীন ব্যান্ডের গায়ক শেখ ইশতিয়াক এবং মারিনা হোসেনের। গেল ১০ জানুয়ারি চার হাত এক হয়েছে তাদের। গতকাল সোমবার ঢাকা মেইলকে প্রণয়ের পথ পাড়ি দিয়ে পরিণয়ের পথে হাঁটার গল্প শুনিয়েছেন ইশতিয়াক।
বিজ্ঞাপন

সম্পর্কটা বন্ধুত্বের হলেও ইশতিয়াক ডুব দিয়েছিলেন মারিনার মনের গহীন গাঙে। বিভিন্নভাবে বোঝাতে চাইতেন ভালো লাগার কথা। অবশেষে একদিন মনের ঝাপি খোলেন। সে গল্প ইশতিয়াকের থেকেই শোনা যাক।
তার কথায়, ‘এটা বেশ ইন্টারেস্টিং। ২০২২-এর শুরুর দিকে। ফ্রান্সের দূতাবাসের আমন্ত্রণে শিরোনামহীনের প্যারিস সফর ছিল। যাওয়ার আগে ভাবলাম — লম্বা সময়ের জন্য যাচ্ছি, বলে যাই। মাঝে একটা গ্যাপ থাকবে, আবার কবে দেশে ফিরব— ভেবে ওকে (মারিনা হোসেন) ভালোবাসার কথা জানানোর সিদ্ধান্ত নেই। যদিও আগেই বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। সেভাবে নিজেকে এক্সপ্রেস করতে পারি না। তারপরও জানাতে চেষ্টা করেছি— তোমাকে ভালো লেগেছে। এভাবেই আনুষ্ঠানিকভাবে হাত ধরা।’

বিজ্ঞাপন
সম্পর্কে টক-ঝাল খুব স্বাভাবিক। কেউ কেউ এক্ষেত্রে টম অ্যান্ড জেরির রোল প্লে করেন। ইশতিয়াক-মারিনার ভালোবাসাবাসির গল্পে ঝগড়ার দখল কতটা ছিল? খুব একটা আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি উল্লেখ করে গায়ক বললেন, ‘স্বাভাবিকভাবে একটু আধটু ঝগড়াঝাটি কিংবা বোঝাপড়ায় সমস্যা হয়েছে। সম্পর্কে যেরকম হয়। তবে টিপিক্যালি ব্রেকআপ কিংবা এরকম কিছু আমাদের মধ্যে হয়নি।’
প্রণয় থেকে পরিণয়ের গল্পে প্রেমিকার বাবার সামনে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় প্রেমিককে। ইশতিয়াকেরও সে অভিজ্ঞতা হয়েছে। তবে তা উতরেছেন সাহসিকতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ওর বাবাকে সরাসরি গিয়ে ব্যাখ্যা করে অ্যাপ্রোচ করি। সব জানাই। আমাদের লাইফ স্টাইল কেমন, কীভাবে কনসার্টে যাই— বোঝাই। সব শুনে উনি রাজি হন।’

শিল্পীদের নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতর নেতিবাচক ধারণার দখল বেশ। এই যেমন তারা অগোছালো, নানাবিধ বদভ্যাসে আক্রান্ত, ঘরের প্রতি একঝুড়ি অবহেলা অসচেতনতা সঙ্গে নিয়ে ঘোরে ইত্যাদি। ওই জায়গা থেকে ইশতিয়াকের ঘরে কন্যাদানে কোনো শর্তও জুড়ে দিয়েছিল মারিনার পরিবার? তার কথায়, ‘আর্টিস্টদের নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা নেগেটিভ ধারণা আছে। ৭০-৮০ দশকের রকস্টারদের মধ্যে এরকম একটা ছাপ ছিল। তবে আমি আমার শ্বশুর তার পরিবারের সদস্যদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি— এখনকার রকস্টাররা অনেক গোছালো, নিজের প্রতি সচেতন। আমি কৃতজ্ঞ যে তিনি বুঝতে পেরেছেন এবং আমাকে গ্রহণ করেছেন।’
গল্প শেষের দিকে। দৃশ্যপট রচিত হয় ছয়-সাত মাস আগে। সেখানে দেখা যায়, দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে মারিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে চমকে দিচ্ছেন ইশতিয়াক। তিনি বলেন, ‘ওটা ওর জন্য একটা সারপ্রাইজ ছিল। বিয়ের প্রপোজাল যে দিতে যাচ্ছি সেটা দুই পরিবারের সবাই মোটামুটি জানলেও মারিনা জানত না।। এটা সম্ভব হয়েছিল ওর বাবা-মায়ের সহযোগিতায়। কক্সবাজারে একটি ফেস্টিভ্যাল ছিল। সেখানে বিয়ের প্রস্তাব দিই। সঙ্গে আমার ও মারিনার পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং কাছের কিছু বন্ধু-বান্ধব ছিল। পরিকল্পনাটা সম্পূর্ণ আমার ছিল।’

শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে নতুন জামাই ইশতিয়াকের সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা কেমন? সম্পর্কের মাঝে তারকাখ্যাতি কতটা প্রভাব ফেলে? জবাবে বলেন, ‘আমি খুব সুন্দর একটি ফ্যামিলি পেয়েছি। সবাই কো-অপারেটিভ। আর আমি স্টারডমটাকে ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে জড়াতে অপছন্দ করি। চেষ্টা করি ফ্যামিলি, ফ্রেন্ডদের সঙ্গে থাকা সময়টুকুতে স্টারডমকে এক পাশে রাখতে। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারি, আমি সেলিব্রেটি। কেমন করে আমার সাথে কথা বলবে এটা অনেকের মধ্যে কাজ করে। আমি খুব বিব্রতবোধ করি। এর বাইরে আট দশটা ছেলে যেভাবে শ্বশুরবাড়িতে নতুন বর হিসেবে সমাদর পায় সেভাবেই পেয়েছি।’
সৃষ্টিশীলতা অনেক সময় সম্পর্কে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়। থাকো তোমার কাজ নিয়ে— বলে চলে যাওয়ার ঘটনা কম নেই। তবে ইশতিয়াকের গানের সঙ্গে প্রাণের মানুষের বোঝাপড়া দারুণ। তিনি বলেন, ‘মিউজিকের ক্ষেত্রে আন্ডারস্ট্যান্ডিং না হলে হয়তো বিয়েই হতো না। আমাদের কাজ অন্যদের চেয়ে আলাদা। রেকর্ডিং সেশনগুলোতে রাত-দিন এক করে সময় দিতে হয়। এখানে সেখানে মিটিং থাকে। তাছাড়া শিরোনামহীন দেশের ব্যস্ত ব্যান্ডগুলোর একটি। ফলে আমার ব্যস্ততাও বেশি। কিন্তু ও সবকিছু মানিয়ে নিতে পারে। শিরোনামহীনের সবার সঙ্গেও সে দারুণভাবে মিশে গেছে।’

প্রেমিকাকে নিয়ে গান, সুর করেনি এমন শিল্পী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ইশতিয়াকও এর বাইরে নন। প্রেয়সীকে নিজের সুরে বেঁধেছেন জানিয়ে বললেন, ‘আমি নিজে নিজে গান বানাই, সুর করে রাখি। ওকে ভেবেও করা আছে। এখনও প্রকাশ পায়নি। আশা করি শিগগিরই আসবে।’
বিয়ের অধ্যায় শেষ হলেও হানিমুন পড়েছে বিলম্বের ফাঁদে। ব্যস্ততা দিচ্ছে না অবসর। বললেন, ‘আমার স্ত্রী কর্মজীবী নারী। আমারও বেশ ব্যস্ততা। মুহূর্তটা আমাদের জন্য ভরা মৌসুম। সেকারণে এখনও হানিমুনের পরিকল্পনাটা ভালো করা হয়নি। কনসার্টগুলো আগে শেষ করি। আপাতত হানিমুন আমাদের কনসার্টই।’

তবে কোথায় গিয়ে কাটাবেন নিরিবিলি সময় সে নিয়ে কিছুটা ছক কষে রেখেছেন। জানাতে চাইলেন না। কিছুটা রহস্য রইলো। থাকুক। আপন মানুষ নিয়ে আপন মুহূর্তে কিছুটা গোপনীয়তা থাকা ভালো।
আরআর

