গত বছরের শেষ দিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এই সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মন্ত্রণালয়ের কাজ নিজের তত্বাবধানে এগিয়ে নিচ্ছেন। বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে নানামুখী পরিকল্পনা নজর কেড়েছে। তবে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আহমদ রফিকের মৃত্যুর পর সামাজিকমাধ্যমে নানাবিধ প্রশ্নের মুখখুখি হতে হয়েছে ফারুকীকে।
এ প্রসঙ্গে নিজের ফেসবুকে ‘কৈফিয়ত’ শিরোনামে একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন। পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমার বন্ধুদের একজনের একটা লেখা আমার নজরে এসেছে। যার আসল বক্তব্য হচ্ছে এই যে, শিল্পী-সাহিত্যিকদের মৃত্যুর পর কেন উদযাপন করা হয়? জীবদ্দশায় তাদের নিয়ে কিছু করা হয় না কেন? আহমদ রফিকের মৃত্যু প্রসঙ্গে এই ভ্যালিড প্রশ্নটা সে তুলেছে। এটা আরও অনেকেরই প্রশ্ন হওয়া স্বাভাবিক। এই প্রশ্ন আমরাও সবসময়ই করতাম।’

এরপর উপদেষ্টা লিখেছেন, ‘প্রথমে আহমদ রফিকের প্রসঙ্গে একটু কৈফিয়ত দেই। আহমদ রফিক জীবিত থাকা অবস্থায় আমরা উনার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। আমাদের একটা বড় পরিকল্পনা হচ্ছে বাংলাদেশী কিংবদন্তিদের জীবন এবং কাজ সেলেব্রেট করা। এটা শুরু হবে স্থানীয় পর্যায়ে। ধীরে ধীরে এটা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও যাবে। এটার জন্য একটা ক্যালেন্ডার করছে শিল্পকলা একাডেমি। এবং এই অনুষ্ঠানগুলো যেনো বোরিং এবং অপ্রাসঙ্গিক সরকারী অনুষ্ঠানে পর্যবসিত না হয় সেটা মাথায় রেখে অনুষ্ঠান কার্যসূচিতে মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। যেমন সলিমুল্লাহ খান আর ব্রাত্য রাইসুকে উদযাপনের অনুষ্ঠান এক হতে পারে না।’
ফারুকী আরও লিখেছেন, ‘যাইহোক ক্যালেন্ডার তৈরি হতে হতে আমরা বসে থাকছি না। আমরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছি। কয়দিন আগে সাবিনা ইয়াসমিন আপাকে নিয়ে আমরা এরকম একটা কাজ করেছিলাম। সেখানে শিল্পী খুরশিদ আলম ভাই বলেই ফেলেছেন এরকম আয়োজন উনি আগে দেখেননি। অক্টোবরের আট তারিখে উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমরা লালবাগ কেল্লায় একটা ধ্রুপদী সন্ধ্যার আয়োজন করেছি। যেখানে এই প্রজন্মের শিল্পীরাও পারফর্ম করবেন। পাশাপাশি উনার ছেলে আলী আকবর খাঁ সাহেবের নাতি সিরাজ খাঁ সাহেব দেশে আসছেন ঐ অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার জন্য।’
এখানেই শেষ না, তিনি যোগ করেন, ‘যারা আমাদের মাঝে আছেন আর যারা চলে গেছেন তাঁদের সবাইকেই আমরা উদযাপন করব। এবং সেটা শিল্প-সংস্কৃতির সকল শাখার শিল্পর জন্যই প্রযোজ্য। বদরুদ্দীন উমর যেমন থাকবেন, হুমায়ুন আহমেদও থাকবেন, সেলিম আল দীন থাকবেন, রক লেজেন্ড জেমস ভাইও থাকবেন, তারেক মাসুদও থাকবেন, এস এম সুলতানও থাকবেন, নাসির আলী মামুনও থাকবেন, আরও অনেকেই থাকবেন।’

উপদেষ্টা ফারুকী বলেন, ‘এই তালিকায় আহমদ রফিক ভাইও আছেন। আমরা চেয়েছিলাম উনি বেঁচে থাকতেই একটা আয়োজন করতে। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে যখন আমরা যাই তাঁকে দেখতে, তখন বুঝেছিলাম দুর্ভাগ্যজনক হলেও উনার শারীরিক অবস্থা এইরকম আয়োজনে যোগ দেয়ার মতো না। পাশাপাশি আরেকটা কথা বলা দরকার। যেটা আমরা কখনোই বলতে চাই নাই। উনি অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই অনেকেই আমাকে লিখেছেন আমরা কেন কিছু করছি না। অর্থনৈতিক দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে। আমি শুধু এইটুকু বলতে চাই সরকার তার দায়িত্ব সর্বোচ্চ পালন করেছে। ফেব্রুয়ারিতেও করেছে, এখনও করেছে। কিন্তু শিল্পী-সাহিত্যিকদের সাহায্য করে ফটো তুলে প্রচার করাটা আমাদের কাছে অসম্মানজনক মনে হয়েছে বিধায় আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর যাদের যাদের পাশে দাঁড়িয়েছি সেগুলো কোনোটাই প্রচার করিনি। আজকেও করতাম না, কিন্তু কেউ কেউ অভিযোগ করাতে বলতে হলো।’
উপদেষ্টা উল্লেখ করেছেন, অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসা এই সরকারের পক্ষে বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা কোনোভাবেই হাত গুটিয়ে বসে নেই। ফারুকীর কথায়, ‘আমরা অল্পদিনের সরকার। সবকিছু বদলানো সম্ভব না। তবে চেষ্টা করছি যতটুকু সম্ভব ভুমিকা রাখতে। কালচারাল ইনক্লুসিভনেস, জুলাই ন্যারেটিভ নিয়ে কাজ আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে করার চেষ্টা করেছি। সামনে শিল্পকলা একাডেমি গান এবং নাচের স্কুলের ব্যাপারে কিছু বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। একাডেমিতে নতুন বিভাগ আসবে। ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম, থিয়েটার, মিউজিক ফেস্টিভ্যাল নিয়ে কাজ হচ্ছে। বিয়েনালকে রিভাইটালাইজ করার কাজ চলছে। ইট টেকস টাইম।’’
সবশেষে তিনি লিখেছেন,’ আমরা শুরু করে দিয়ে যাচ্ছি। পরবর্তী সরকার এসে এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর আমিও মুক্তি পাব এই কঠিন দায়িত্ব থেকে! এটা আরও কঠিন কারণ, এটি এমন একটি কাজ যার জন্য কেউ কৃতজ্ঞতা জানায় না। এছাড়া আমার নিজের ছবি না বানানোর যন্ত্রণাতো আছেই।’
ইএইচ/




