বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

কান চলচ্চিত্র উৎসবে গাজায় শহিদ ফটোসাংবাদিক ফাতিমার সাহসিকতার গল্প 

আলমগীর কবির
প্রকাশিত: ১৫ মে ২০২৫, ১০:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

কান চলচ্চিত্র উৎসবে গাজায় শহিদ ফটোসাংবাদিক ফাতিমা সাহসিকতার গল্প 

ফিলিস্তিনি ফটোসাংবাদিক  ফাতিমা হাসুউনা এক সংগ্রামী জীবন কাটিয়েছেন, যেখানে প্রতিটি ছবি, প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি কথাই ছিল প্রতিরোধের এক শক্তিশালী ভাষা। গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর কখনও নীরব হতে পারেনি, এবং মৃত্যুর পরেও তার কণ্ঠটি বিশ্বব্যাপী প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।  

ফাতিমার এই সংগ্রাম ও তাঁর জনগণের অবস্থা চিত্রিত করার চেষ্টা নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি বিশেষ ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র। নাম ‘পুট ইউর সোল অন ইয়োর হ্যান্ড অ্যান্ড ওয়ক’, যার বাংলা অর্থ ‘তোমার আত্মাকে তোমার হাতে তুলে নাও এবং হেঁটে চল’। এটি পরিচালনা করেছেন নির্বাসিত ইরানি পরিচালক সেপিদেহ ফারসি। বৃহস্পতিবার (১৫ মে) সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবের এসি.আই.ডি সাইডবার ক্যাটাগরিতে প্রদর্শিত হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


এখানে বলা প্রয়োজন যে এসি.আই.ডি চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা থেকে বাইরে থাকা স্বাধীন চলচ্চিত্রগুলোর জন্য নির্ধারিত। এটি মূলত নতুন ও সাহসী নির্মাতাদের কাজকে তুলে ধরার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত।

কে এই ফাতিমা হাসুউনা
ফাতিমা হাসুউনা, একজন প্রশিক্ষিত ফটোসাংবাদিক এবং কবি, তাঁর মৃত্যুর আগে, গাজায় সংঘটিত চলমান মানবিক বিপর্যয় এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি চাই না শুধু একটা সংখ্যা হয়ে থাকি, কিংবা কোনো খবরে পরিণত হই। আমি চাই এমন এক মৃত্যু যা পৃথিবী শুনবে, এমন এক প্রভাব যা সময় বা স্থান দ্বারা ম্লান হবে না।’ তবে, তার এই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয় এবং তাঁর জীবনকথা আজকের দিনে একটি বৈশ্বিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ১৬ এপ্রিল তার বিয়ের মাত্র কয়েক দিন আগে, ২৫ বছর বয়সী ফাতিমা উত্তর গাজায় তার বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন। তার গর্ভবতী বোনসহ পরিবারের আরও ১০ সদস্যও এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। গাজার অবরুদ্ধ ভূমিতে তাঁর জীবন কাটলেও, তাঁর কণ্ঠ এবং তাঁর চিত্রগ্রহণ বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়ে যায়।

Fatma_2
ফাতেমার ক্যামেরায় গাজার দৃশ্য

কানে ‘পুট ইউর সোল অন ইয়োর হ্যান্ড অ্যান্ড ওয়ক’
গাজার এই শহিদ ফটোসাংবাদিকের জীবনকাহিনী নিয়ে তৈরি ডকুমেন্টারি ‘পুট ইউর সোল অন ইয়োর হ্যান্ড অ্যান্ড ওয়ক’ বৃহস্পতিবার কান চলচ্চিত্র উৎসবে এক আবেগপূর্ণ প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে প্রিমিয়ার হয়েছে। ছবিটির পরিচালক সেপিদেহ ফারসি জানান,  ফাতিমা তার চোখ ছিলেন গাজার। ‘ফাতিমা ছিল জীবন্ত এবং পূর্ণ উদ্দীপনায় ভরা। আমি তার হাসি, তার কান্না, তার আশা এবং তার নিরাশার ছবি ধারণ করেছিলাম।’

এই চলচ্চিত্রটি দুই নারীর এক অদ্ভুত সংযোগের গল্প তুলে ধরে, যাদের মধ্যে একদিকে ফাতিমা, যিনি গাজা থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাইরের দুনিয়া দেখতে চেয়েছিলেন, আর অন্যদিকে ফারসি, যিনি গাজার বিভীষিকাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

ফারসি ও  ফাতিমার মধ্যে ফোনে কথোপকথন, ছবির মাধ্যমে গাজার বাস্তবতা তুলে ধরার যন্ত্রণা এবং তাদের অসীম ধৈর্য এর মূল গল্প। তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল সল্পকালীন, কিন্তু তীব্র, আর যুদ্ধের সত্যিকারের চিত্র ফুটে উঠেছে  ফাতিমার চোখে। তাঁর ছবি শুধু যুদ্ধের চিত্র নয়, বরং গাজার মানুষের প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী প্রমাণ।

ফাতিমার সংগ্রাম
‘পুট ইউর সোল অন ইয়োর হ্যান্ড অ্যান্ড ওয়ক’ ডকুমেন্টারি ২০১৪ সালের গ্রীষ্ম থেকে শুরু হয়, যখন ইসরায়েলের এক ভয়াবহ হামলা গাজার রাফাহ শহরকে ধ্বংস করতে শুরু করে। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা, অসহায় মানুষের কষ্ট, খাদ্য সংকট, হাসপাতালের সংকটের পরিস্থিতি, এ সবই এই চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে। এছাড়া,  ফাতিমার ছবি এবং তার কথোপকথনে গাজার সাধারণ মানুষের অবস্থা ফুটে ওঠে—বিধ্বস্ত শহর, ক্ষুধার্ত শিশুরা এবং বিস্ফোরণের মাঝে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

ফাতিমা তার ছবির মাধ্যমে গাজার প্রতিবন্ধকতাকে পৃথিবীজুড়ে তুলে ধরেছিলেন। তার ছবি ছিল শুধু যুদ্ধের ছবি নয়, বরং এক ধরনের প্রতিবাদ।  ফাতিমা বলেছিলেন, ‘আমরা বেঁচে আছি, আমরা হাসছি। তারা আমাদের পরাজিত করতে পারবে না, কারণ আমাদের হারানোর কিছু নেই,। যুদ্ধের মধ্যে হাসি, জীবন আর সংগ্রাম  ফাতিমার চিত্রকর্মের অমূল্য দিক ছিল।

শহিদ  ফাতিমার স্মরণে কান চলচ্চিত্র উৎসব
ফিল্মটির প্রদর্শনীতে কান উৎসবের অংশ হিসেবে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিরা  ফাতিমার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। অভিনেতা রালফ ফায়েনস এবং রিচার্ড গিরে’সহ ৩৮০ জন চলচ্চিত্র শিল্পী একত্রে গাজার গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে একটি ওপিনিয়ন পিসে সই করেছেন। এই সিনেমার মাধ্যমে  ফাতিমার চিত্রকর্ম ও কবিতার প্রতি সম্মান জানানো হয়েছে, এবং গাজার জনগণের অবস্থা বিশ্বজুড়ে আরো স্পষ্ট হয়েছে।

Fatma

“তারা আমাদের পরাজিত করতে পারবে না”
সেপিদেহ ফারসি বলেছেন, ‘ফাতিমা যে সাহসিকতা দেখিয়েছে তা শুধু গাজার জনগণের জন্য নয়, বরং পৃথিবীজুড়ে সকল নিপীড়িত মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণা। আমরা যদি না করি, তাহলে কে করবে?’ এই চলচ্চিত্রটি শুধু গাজার জনগণের জন্য নয়, বিশ্ববাসীর জন্য এক শক্তিশালী বার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই বিশ্বে,  ফাতিমার মতো সাহসী কণ্ঠের অভাব কখনও পূর্ণ হবে না।

//

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর