রোববার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

দ্রব্যমূল্যের ধাক্কা শিক্ষার্থীদের খাবারের মেনুতেও

এস এম শাহাদাত হোসেন অনু
প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০২৩, ০৮:৩১ এএম

শেয়ার করুন:

দ্রব্যমূল্যের ধাক্কা শিক্ষার্থীদের খাবারের মেনুতেও

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী তৌফিক (ছদ্মনাম) কয়েকমাস আগেও সপ্তাহের দিনগুলোতে পর্যায়ক্রমে মাংস, মুরগি, ডিম ও সবজি দিয়ে খাবার খেতে পারতেন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে পাল্টে গেছে সবকিছু। দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় লাগাম টানতে হয়েছে তৌফিককে। এখন মাছ-মাংস কিংবা ডিম নয়, দিনের পর দিন সবজি-ভাত খেয়েই দিন কাটছে এই শিক্ষার্থীর। এমনকি মাঝেমধ্যে তিনবেলার জায়গায় দুইবেলাও খেতে হয় তার।

চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আকাশ (ছদ্মনাম)। থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই একটি মেসে। চলেন টিউশনি করিয়ে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে গত ১ মাস ধরে খাবার ও বাজারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। আগে যেখানে মাসের অধিকাংশ সময় খাবারের তালিকায় অন্তত মাছ বা মুরগি থাকত, সেখানে এখন শাক-সবজিই ভরসা। আর ছোট মাছ বা ডিম কিনলে একদিনের জায়গায় দুইদিন চালান এই শিক্ষার্থী। গত ১৫ দিনে একবেলাও মাছ বা মাংস খাওয়ার সুযোগ হয়নি তার। শুধু খাবার নয়, সবকিছুর খরচই বেড়ে গেছে।


বিজ্ঞাপন


তৌফিক বা আকাশের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের অনেকেই খাবারের মেনুতে পরিবর্তন এনেছেন। খাবারের মূল্যবৃদ্ধিসহ জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যয়বৃদ্ধিকেই কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন তারা।

JNUদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল ও ক্যান্টিন থাকলেও জবি শিক্ষার্থীদের সেই সুযোগ নেই৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একটি ক্যান্টিন। সেখানেও স্বল্পমূল্যে খাবারের ব্যবস্থা নেই। উল্টো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে এখানেও। দাম না বাড়ালেও খাবারের পরিমাণ কমে গেছে। একমাত্র সেই ক্যান্টিনে সকালের নাস্তায় প্রতি শিক্ষার্থীর খরচ হয় ৩০-৪০ টাকা৷ দুপুরে ভাত-মাছ ৪৫ টাকা, ভাত-মুরগি ৪৫ টাকা, ভাত-ডিম-ভর্তা-ডাল ৩৫ টাকা৷ তবে প্রতি বেলাতেই খাবার নির্ধারিত সময়ের আগে শেষ হয়ে যায়। ফলে ক্যান্টিনের খাবারটুকুও সবার ভাগ্যে জোটে না।

এছাড়া ক্যান্টিনে জায়গার পরিমাণও কম। ফলে অনেককে দাঁড়িয়ে বা বাইরে বসে খেতে হয়। ক্যান্টিনে সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যার খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও নেই রাতের খাবারের ব্যবস্থা।

শিক্ষার্থীদের দাবি, ক্যান্টিনের সংখ্যা বাড়িয়ে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিলে কম দামে পরিমাণ মতো খাবারের সুযোগ পাওয়া যেত।


বিজ্ঞাপন


JNUবিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতেও (ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র) খাবারের চিত্র একই। এখানে একটি পাউরুটির দামই ২০ টাকা। একজন শিক্ষার্থী সকালের নাস্তায় রুটি-কলা ও চা খেলে খরচ হয় ৪০-৫০ টাকা। আর ভাত-মাছ, ভাত-মাংস বা খিচুড়ির দামও লাগামহীন এখানে। টিএসসিতে মুরগি-ভাত ৭০ টাকা, মাছ-ভাত ৭০ টাকা, খিচুড়ি ৪৫-৫০ টাকা। এছাড়া পাউরুটি, ডিম, ভাজির দাম তুলনামূলক বেশি৷ এখানেও রয়েছে জায়গা স্বল্পতা।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল ‘বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে’ রান্নার পরিবেশ ও মান নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। ছাত্রী হলে ভাতের প্লেট ১০ টাকা, পাতলা ডাল ২ টাকা, ভর্তা-শাক ১০ টাকা, রুই, সরপুঁটি, কাতলা, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া ও কই মাছের দাম (প্রতি পিস) ৩০ টাকা, পাবদা ও ইলিশ মাছ (প্রতি পিস) ৩৫ টাকা, ছোটমাছ ও চিংড়ি ৩৫ টাকা, দেশি মুরগি ৪০ টাকা, ব্রয়লার ৩০ টাকা, মুরগি খিচুড়ি ৫০ টাকা, তেহারি ৭০ টাকা, মুড়িঘণ্ট ২৬ টাকা এবং শাকের সাথে মাছের মাথা ভুনা ১৫ টাকা।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে এই ছাত্রী হলে খাবারের দাম না বাড়ালেও প্রতিটি আইটেমের পরিমাণ কমে গেছে। এখানকার খাবারের মান নিয়েও ছাত্রীদের নানা অভিযোগ। এমনকি মাঝেমধ্যে খাবারে তেলাপোকাসহ বিভিন্ন পোকামাকড়ও পাওয়া যায়।

JNUবেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের ক্যান্টিন ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর ঢাকা মেইলকে বলেন, সব জিনিসের দাম বাড়তি৷ তাই পরিমাণ কমানো ছাড়া উপায় নেই৷ কর্তৃপক্ষ ভর্তুকি দিলে মূল্য ও খাবারের পরিমাণ সমন্বয় করা সম্ভব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমার বাসা পুরান ঢাকায়। আগে ডিম-ভাত বা খিচুড়ি দিয়ে সকালের নাশতা করতাম। ইদানীং মূল্যবৃদ্ধির ফলে সকালের নাশতা থেকে ডিম বাদ দিয়েছি। ভালো খাবার খাওয়ার সাহস হয় না। টাকা বাঁচাবো নাকি নিজেকে বাঁচব সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না।

এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে রাতের খাবারের সুযোগ থাকলে আর দাম আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নিলে উপকার হতো। আমাদের এখানে খাবারেরও পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, আসলে এখন সবকিছুর চড়া দাম। এতে শিক্ষার্থীদের কষ্ট হচ্ছে এটা ঠিক। তবে এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও কিছু করার সুযোগ নেই। ক্যান্টিনের খাবারের দামও বাড়াতে চেয়েছিল মালিক। কিন্তু আমি বারবার বলে সেটি বন্ধ রেখেছি। সবকিছুর দাম বাড়ায় ক্যান্টিনে সামান্য দাম বাড়তে পারে। ভর্তুকির বিষয়টি কর্তৃপক্ষ দেখতে পারে।

প্রতিনিধি/জেএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর