হঠাৎ বৃত্তি পরীক্ষার ঘোষণায় বিপাকে শিক্ষার্থী-অভিভাবক

প্রকাশিত: ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:২০ এএম
হঠাৎ বৃত্তি পরীক্ষার ঘোষণায় বিপাকে শিক্ষার্থী-অভিভাবক

‘আমার মেয়ের পরীক্ষা শেষ হয়েছে নভেম্বরের শেষ দিকে। ডিসেম্বরে নতুন বাসায় ওঠার সময় মেয়ের বই-খাতা সব বিক্রি করে দিয়েছি। হঠাৎ শুনি বৃত্তি পরীক্ষা হবে। এখন বই নিয়ে কি বিপাকেই না পড়লাম! আবার মেয়ে বৃত্তি পরীক্ষায় সুযোগ পাবে কিনা তাও জানি না। মেয়ের পরীক্ষা দেওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতিটাও নাই। বৃত্তি পরীক্ষা কথা অবশ্যই আগে জানানো উচিত ছিল।’ হঠাৎ বৃত্তি পরীক্ষার খবর শুনে এভাবেই নিজের ক্ষোভ আর বিস্ময় প্রকাশ করছিলেন রাজধানীর শুক্রাবাদ চিলড্রেনস গার্ডেনের শিক্ষার্থী অরিত্রি মিত্রর বাবা অনিমেষ মিত্র।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এ পরীক্ষায় সব শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে পারবে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ের বাছাই করা ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী এ পরীক্ষা দিতে পারবে। আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হলেও এখনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। আগামী রোববার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

সরকারের এই ঘোষণায় দীর্ঘ ১২ বছর পর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এই ১২ বছরের মধ্যে গত ২ বছর করোনা ও নতুন শিক্ষাক্রমের কারণে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাও (পিইসি) অনুষ্ঠিত হয়নি। অবশ্য আগামীতেও এ পরীক্ষা হবে না বলেই জানিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

কিন্তু বছরের শেষে এসে গত ১ ডিসেম্বর অনেকটা আকস্মিকভাবে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত বলেন, এই সিদ্ধান্ত তো নতুন নয়। আগে থেকেই এভাবে বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। গত দুই বছর যেহেতু পিইসি কিংবা বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি তাই বৃত্তিও দেয়া সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার জন্যই দ্রুত এই সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই বছরের শিক্ষার্থীরা যাতে বৃত্তি থেকে বঞ্চিত না হয় তাই শেষ মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত।

যদিও এই বক্তব্যের সাথে একমত নন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।

রাজধানীর স্বনামধন্য হলিক্রস স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে নভেম্বরের শেষে। এরপর মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি যান আসিফা হোসেন। তিনি বলেন, ছুটি কাটাতে এসে হঠাৎ করেই শুনি বৃত্তি পরীক্ষা হবে। আমার মেয়ে কিংবা আমাদের কোনো মানসিক প্রস্তুতি নেই। বৃত্তি পরীক্ষা নিশ্চয়ই ভালো কিন্তু সেটা আমাদের আগেই জানানো উচিত ছিল। হঠাৎ এ সিদ্ধান্তের কারণে সব পরিকল্পনা উল্টা-পাল্টা হয়ে গেছে। মেয়ের প্রাইভেট শিক্ষকদেরও ছুটি দিয়েছি। এখন কিভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে।

তিনি আরো বলেন, বাচ্চাদের পরীক্ষার বিষয়ে এরকম হুট-হাট সিদ্ধান্ত নেয়া কোনোভাবেই উচিত হয়নি। বছরের শুরুতে না জানালেও অন্তত একমাস আগে জানানো উচিত ছিল।

এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখনও বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। এসব শিক্ষার্থী লেখাপড়ার মধ্যে থাকলেও বাড়তি পরীক্ষাকে ভালোভাবে নিচ্ছে না। বুধবার রাজধানীর শুক্রাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম পরীক্ষা দিয়ে ফিরছিল। এ সময় জানতে চাইলে সে বলে, বার্ষিক পরীক্ষা শেষ না হতেই আবার পরীক্ষা। প্রস্তুতি নেব কখন?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষা মানেই চাপ। সেখানে এত স্বল্প সময়ের নোটিশে পরীক্ষা নেওয়া মানে আরো চাপে ফেলা। সব শিক্ষার্থী তো বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেয় না। যারা পরীক্ষায় অংশ নেয় তাদেরকে আমরা বছরের শুরু থেকেই প্রস্তুত করি। হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত আমরা নিজেরাও বিপাকে পড়েছি।

বৃত্তি পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান ও গণিত- এই চার বিষয়ে একদিনে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ২ ঘণ্টায় শিক্ষার্থীদের ২০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হবে। স্কুলের বার্ষিক মূল্যায়নে ভালো করেছে,এমন শীর্ষ ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে।

সারাদেশে ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ কোটি ৪১ লাখ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে। এর বাইরেও প্রাথমিক শাখা সংযুক্ত বিপুলসংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। জানা গেছে, সব মিলে শুধু পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এ বছর ৩২ লাখের কাছাকাছি। সে হিসাবে ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী হবে অন্তত ৩ লাখ ২০ হাজার জন।

হঠাৎ করে পরীক্ষার এই সিদ্ধান্তে কতটা মানসিক চাপে পড়তে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা? এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেয়ার হাসপাতাল, রংপুরের মনরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহমিদা আক্তার বলেন, পরীক্ষা ভীতি সবারই থাকে। পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর বয়স কত। হঠাৎ করে এই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে বসানো মানে তাদেরকে মানসিক চাপে ফেলা। সদ্য করোনার ধাক্কা কাটানো এসব শিক্ষার্থী নতুন সিদ্ধান্তকে মানসিক চাপ হিসেবেই দেখবে। তিনি আরো বলেন, পরীক্ষার বিষয়টি বছরের শুরু থেকে তাদের জানানো হলে মানসিক প্রস্তুতি নিতে পারত। আমি অভিভাবকদের অনুরোধ করব, শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে চাপে ফেলবেন না। চাপের কারণে হিতে বিপরীত হতে পারে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আগে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পিএসসি পরীক্ষার নামে মানসিক চাপে ফেলা হতো। এই পরীক্ষা থেকে সরে এসেছে সরকার, আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু হঠাৎ করে বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীদের চাপে ফেলেছে। কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল এই ঘোষণা আরো কয়েক মাস আগে দেওয়া।

পিএস/জেএম/এএস