শিক্ষায় নানামুখী সংকট

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৮:২৯ এএম
শিক্ষায় নানামুখী সংকট

নানামুখী সংকট ভর করেছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে নেই মানসম্মত শিক্ষক। যুগোপযোগী বেতন কাঠামো এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় মেধাবীরাও আকৃষ্ট হচ্ছেন না শিক্ষকতায়। তার ওপর সাম্প্রতিক শিক্ষক নির্যাতন-নিপীড়ন, শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়া, শিক্ষা প্রশাসনে নানা বৈষম্য, যুগপযোগী শিক্ষাক্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকাসহ স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও শিক্ষা আইন না হওয়ায় শিক্ষার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তারা মনে করেন, শিক্ষা পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার অগ্রগতির সঙ্গে জড়িত। সব জায়গাকেই প্রভাবিত করে শিক্ষা। তাই এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। 

এমন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বুধবার (৫ অক্টোবর) বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘শিক্ষার পরিবর্তনের শুরু শিক্ষক দিয়ে’। শিক্ষকদের মাধ্যমেই শুরু হয় শিক্ষার পরিবর্তন-এটাই জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকোর বার্তা। 

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, শিক্ষার দুটি দিক রয়েছে। একটি- ব্যবস্থাগত দিক দ্বিতীয়টি- টিচিং, লার্নিং, প্যাথলজি, এন্ড্রোলজি ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের দেশে স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপিত হয়েছে অথচ শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় যে পেশাদারিত্ব ও মৌলিকত্বের যে জায়গায় থাকার কথা সেটা কিন্তু বিল্ডাপ হয়নি। আমাদের ফিউচার এডুকেশন নিয়ে নানা চিন্তাভাবনা চলছে। ব্ল্যান্ডার এডুকেশন নিয়ে কথা বলছি আমরা। টেকনোলজি ব্যবহার করাসহ ক্যারিকুলামে নানা পরির্বতন আসছে। এগুলো বাস্তবায়ন, কিন্তু শিক্ষকরা ও তার ম্যানেজমেন্টে জড়িত যারা আছেন তারাই করবেন। তাই টিচিং লার্নিংয়ের জায়গাটা এখানে আসলে আকর্ষণীয় হতে হবে। শিক্ষকতায় মেধাবীদের নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাকে বিচ্ছিন্নভাবে ভাবলে চলবে না। শিক্ষা পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার অগ্রগতির সঙ্গে জড়িত। এডুকেশন কিন্তু সব জায়গাকে প্রভাবিত করে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষক-কর্মচারীরা ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা পান। স্কেলভিত্তিক পূর্ণ বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসাভাতা, উৎসব বোনাসের পাশাপাশি বার্ষিক পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও পান। আর বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন স্কেলও সরকারিদের সমানই। তবে তা কেবল মূল বেতনে। বাকি সব ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা তারা সরকারি চাকরিজীবীদের মতো পান না। অবশ্য বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বড় অংশই এমপিওভুক্ত নন। এসব শিক্ষক-কর্মচারীর অবস্থা আরও শোচনীয়। কেননা তাদের বেতন-ভাতায় নিয়মের কোনো বালাই নেই। প্রতিষ্ঠান ভেদে এ বেতন স্কেল ও পদ্ধতি ভিন্ন। 

এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরাও জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন পান। তবে বেতন স্কেল নিয়ে শিক্ষকদের ক্ষোভ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা বেতনের স্কেল পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন। 

জাতীয় অধ্যাপক মরহুম কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি হয়। ২০১০ সালের মে মাসে কমিটির সুপারিশ করা শিক্ষানীতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। যা শিক্ষানীতি-২০১০ নামে পরিচিত। কিন্তু এক যুগের বেশি সময় পরও এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। 

শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদার বিষয়ে এতে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা শুধুমাত্র সুবিন্নস্ত বাক্য গাঁথার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে প্রকৃত অর্থে তাঁদের সামাজিক মর্যাদা দেওয়া না হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা সম্ভব নয়। আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হবে। 

আরও বলা হয়েছে, শিক্ষার সবস্তরের জন্য উপর্যুক্ত দুটি বিষয়ে অর্থাৎ মর্যাদা ও বেতনভাতাসহ সুযোগ-সুবিধার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা সুপারিশ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের প্রতিনিধিত্ব সংবলিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হবে। 

শিক্ষানীতির এসব সুপারিশ এখনও কাগজেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করেন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। তিনি বলেন, ‘শিক্ষানীতি-মোম এ শিক্ষকদের মর্যাদাবৃদ্ধি এবং স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এগুলো শুধুই কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। 

তিনি আরও বলেন, ১০ বছরের মধ্যে শিক্ষানীতির সুপারিশগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু যারা বাস্তবায়নের দায়িত্বে তাদের গাফিলতির কারণেই মূলত এগুলো আলোর মুখ দেখছে না। 

এক যুগেও শিক্ষানীতির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়াকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা’ বলে মন্তব্য করেছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘এটাই আমাদের কঠিন অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা।’ 

তিনি আরও বলেন, মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্মত শিক্ষক প্রয়োজন। মানসম্মত শিক্ষক পেতে হলে অবশ্যই সময়োপযোগী বেতন-ভাতা ও মর্যাদার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু সুপারিশ শিক্ষানীতি-২০১০’এ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এগুলো এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক। 

আকর্ষণীয় যুগোপযোগী বেতন কাঠামো না থাকায় মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন না বলেও জানান তিনি। বলেন, বর্তমানে শিক্ষকদের যে বেতন ভাতা দেওয়া হয় এতে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হচ্ছে না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা তো আরও খারাপ। আর কিন্ডারগার্টেনগুলোর কথা না-ই বললাম। 

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, এক সময় প্রবাদ ছিল ‘যার নেই কোনো গতি, সে করে উকালতি’। আর এখন ‘যার নেই কোনো গতি সে করে শিক্ষকতা’। এখন যার গতি আছে সে আমরা হচ্ছে, প্রশাসনের ক্যাডার হয়ে ছড়ি ঘুরাচ্ছে। এখন কোনো মেধাবী শিক্ষকতায় আসতে চায় না। আর মেধাবীদের শিক্ষকতায় আসতে যদি উদ্ভুদ্ধ করা না যায় তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হবে না। 

অন্যদিকে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন কলেজকে সরকারিকরণ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। শুধু এসব কলেজ নয় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই রয়েছে শিক্ষক সংকট। যার ফলে ব্যাঘাত ঘটছে পাঠদানে।

শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে শাহেদুল খবির চৌধুরী আরও বলেন, শিক্ষক সংকট নিরসনের জন্য পর্যাপ্ত পদ লাগবে। এই পদ সৃজনের একটি দায়িত্ব রয়েছে সরকারের। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা পদ সৃজনের প্রস্তাব দিয়েছি। সেটি ৪ থেকে ৫ বছর থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ঝুলছে। তাহলে প্রশ্নটি দাঁড়ায় আপনি আমাকে কোয়ালিটি উন্নতি করতে বলছেন, কিন্তু হাত পা বেঁধে দিয়েছেন। পর্যাপ্ত শিক্ষক যদি না থাকে তাহলে কীভাবে কোয়ালিটি এডুকেশন ইনশিউর করা সম্ভব। 
 
এছাড়াও শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা না থাকায় শিক্ষায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, পেশাদারিত্বে জায়গায় যদি ওই পেশার লোক যদি না থাকে তাহলে অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে অনেকে বলে থাকেন এটাতো অ্যাডমিনিস্টেটিভ ইস্যু। কিন্তু না এটাকে কোনোভাবেই আলাদা করা যাবে না। কারণে পলিসি ফরমোলেইট করার ক্ষেত্রে যিনি ওই বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তিনিই ভালো পলিসি ফরমোলেইট করতে পারবেন। এজন্য আমরা বলে থাকি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের স্বার্থে কৃত্য পেশাভিত্তিক প্রশাসন দরকার। সেক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষকদের পদায়ন করতে হবে। এটি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শন। পেশাজীবিদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি।

এসএএস/এইউ