বিলুপ্তপ্রায় বামুন শালিকের খোঁজ মিলেছে রাবি ক্যাম্পাসে

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
রাবি
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৩৪ এএম
বিলুপ্তপ্রায় বামুন শালিকের খোঁজ মিলেছে রাবি ক্যাম্পাসে
ছবি : ঢাকা মেইল

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বছর জুড়ে সেজে থাকে নানা রূপে। সবসময় দেশীয় আর পরিযায়ী পাখির কলতানে মুখরিত থাকে পুরো ক্যাম্পাস। প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখির আবাসস্থল এ ক্যাম্পাস। তবে এসব পাখির মধ্যে খোঁজ মিলেছে অতি বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় বামুন শালিকের। নিরাপদ বাসস্থান হিসেবে সবুজ এ ক্যাম্পাসে সংসার পেতেছে দেশের দুর্লভ প্রজাতির এই পাখিটি।

দেশে প্রায় ১১ প্রজাতির শালিকের বিচরণ সংরক্ষণ করা হয়েছে। আমাদের চারপাশে যে শালিক বা শালিক-যুগলকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তার নাম ভাত শালিক। শালিকদের মধ্যে খাটো বা বেঁটে আকৃতি হওয়ায় এ শালিকের নামকরণ করা হয়েছে বামুন শালিক। কেউ কেউ একে 'বামুনি কাঠশালিক' বলেও উল্লেখ করে থাকে। আবার 'শঙ্খ শালিক' নামেও পরিচিত।

জানা যায়, পাখিটির ইংরেজি নাম Brahminy Starling; বৈজ্ঞানিক নাম Sturnus pagodarum,গানের পাখি হিসেবে এরা বেশ পরিচিত। আমাদের দেশে এরা অতি দুর্লভ আবাসিক পাখি। শালিক ও ময়না একই পরিবারভুক্ত পাখি। এরা বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে চিরসবুজ পাহাড়ি বন পর্যন্ত বিচরণ করে থাকে। ফলমূল ও কীটপতঙ্গ খেয়ে এরা প্রতিবেশ ব্যবস্থায় ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ফুলের মধু খাওয়ার মাধ্যমে এরা পরাগায়ণের কাজটিও করে থাকে।

shalik

পাখি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুজ্জামান মো. সালেহ রেজা বলেন, 'বামুন শালিক এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বলা যায়, বিরল থেকে অতি বিরল। এখন আর চোখেই পড়ে না! আমাদের দেশে এদের অত্যন্ত কম সংখ্যায় দেখা যায়।

আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিরল এই প্রজাতির পাখির বসবাস রয়েছে। এই পাখিটি বাংলাদেশের আর কোথাও সেভাবে দেখা যায় না। ক্যাম্পাসের বেশ কয়েকটি জায়গায় এই পাখিটির বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে শহীদ মিনার, কেন্দ্রীয় মসজিদ, স্টেডিয়ামের আশপাশসহ প্রায় ক্যাম্পাসের সব জায়গায় এদের চোখে পরে।

shalik

এই গবেষক বলেন, বামুন শালিকের দৈর্ঘ্য ২৩ সেন্টিমিটার। ওজন হয়ে থাকে গড়ে ৪০ গ্রাম। বামুন শালিক একটু নাদুস-নুদুস পাখি। কপাল থেকে মাথা হয়ে গলা পর্যন্ত কালো, যা ঝুঁটিতে রূপ নেয়। ছেলেপাখির মাথার ঝুঁটি ঘাড়ের পেছনে ঝুলে থাকে। শরীরের পালক ফোলালে ঝুঁটিটি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। চোখের নিচ থেকে ঘাড়ের পাশ এবং থুতনি থেকে সম্পূর্ণ নিচের অংশ লালচে-কমলা। প্রজনন মৌসুমে ছেলে পাখিদের মধ্যে এই রঙ অধিক গাঢ় দেখায়। দেহের ওপরের দিকটা সম্পূর্ণ ধূসরাভ। কালচে লেজের সম্মুখভাগ সাদা বর্ণ এবং চোখের পেছনের চামড়া নীল রঙের। পা, পায়ের পাতা ও নখ হলুদ। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারা অভিন্ন।

এর নামকরণ সম্পর্কে ড. সালেহ রেজা বলেন, বেঁটে আকৃতি এবং একটি ইংরেজি নামের অনুসরণে এটিকে বামুন শালিক হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। যেমন-আমাদের শঙ্খচিল পাখি। এর ইংরেজি নাম 'ব্রামিনি কাইট'। বামুন শালিককেও একই কারণে 'শঙ্খ শালিক' নামে ডাকা হয়। এই শঙ্খ মানে সাদা নয়। ব্রামিনি রংকেই শঙ্খ বলা হয়। আমাদের দেশে যে ভাত শালিক দেখা যায়, তার থেকে এটা অনেক ছোট আকৃতির। বামুন শালিক সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় থাকে। কোনো পাহাড়ি অঞ্চলে এ পর্যন্ত এদের দেখা যায়নি। এরা তৃণভূমি, আবাদি জমি, সমতল মাটিতে হেঁটে হেঁটে খাবার খোঁজে। মাটিতে থেকে সব খাবার জোগাড় করে খায়। খাদ্য তালিকায় রয়েছে পোকামাকড় ও রসালো ফল। ফেব্রুয়ারি-সেপ্টেম্বর মাস এদের প্রজনন মৌসুম। এ সময় এরা গাছের গর্তে ঘাস বা আবর্জনা দিয়ে বাসা বানিয়ে তিন-চারটি ডিম পাড়ে বলে জানান এই গবেষক।

shalikh

তবে পাখিদের অঘোষিত অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দিন দিন তার চিরচেনা রুপ হারিয়ে ফেলছে বলে মত সংশ্লিষ্টজনের। এর পেছনে তাঁরা ক্যাম্পাসে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল সুউচ্চ বৃক্ষ নিধন, জলাশয় ভরাটসহ প্রশাসনের ভুল উন্নয়ন কর্মকান্ডকে দায়ী করছেন। ক্যাম্পাসে পাখিদের কলোনি হিসেবে খ্যাত এমন কয়েকটি আবাসস্থল সম্প্রতি ভরাট করে চলছে বিশ্ববিদ্যালয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকান্ড। এছাড়া ক্যাম্পাসে পরিযায়ী পাখিদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত হবিবুর রহমান হলের সামনের জলাশয় ও বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেশিয়ামের পেছনের বড় জলাশয়টি ভরাট করার ফলে গত বছর থেকে ক্যাম্পাসে পরিযায়ী পাখিদেরও চোখে পরছে না।

shalik

তবে বর্তমান প্রশাসন ক্যাম্পাসে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করছে বলে দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তারের। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ের বিষয়টি আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুধাবন করেছি। ইতোমধ্যে আমি এ বিষয়ে পাখি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটনিক্যাল গার্ডেনসহ ক্যাম্পাসের আরও কয়েকটি অঞ্চলকে পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য করে দেওয়ার চেষ্টা করছি বলে জানান তিনি।

প্রতিনিধি/এইচই