বেপরোয়া ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ

রাশিদুল ইসলাম রায়হান
প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:২৬ পিএম
বেপরোয়া ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ

গত এক মাস ধরে নানা ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজধানীর ইডেন সরকারি মহিলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগ। বিশেষ করে সিট বাণিজ্য ও শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভাকে নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। এছাড়া অন্যান্য কয়েকটি ঘটনায় নাম এসেছে কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানারও।

তবে এতে যেন তাদের কিছুই আসে যায় না। তারা একটির পর একটি ঘটনা ঘটিয়েই চলছেন। হয়ে উঠেছেন রীতিমতো বেপরোয়া। এসব ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেই কোনো হস্তক্ষেপ। ন্যূনতম কারণ দর্শানোর নোটিশ পর্যন্তও দেওয়া হয়নি। ফলে এমন সব ঘটনা ছাড়াও অতীতের অনেক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছেন বলে মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত এক মাসে ইডেন ছাত্রলীগের যত অপকর্ম

আগস্টের ২০ তারিখ কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা একটি ছাত্রীনিবাসের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের কয়েক শিক্ষার্থীকে তাদের রুম থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ছাত্রীদের হুমকি দেওয়ার একটি অডিও রেকর্ড ফেসবুকেও ভাইরাল হয়। সেখানে রিভাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করতে শোনা যায়।

কলেজের রাজিয়া বেগম ছাত্রীনিবাসের ২০২ নম্বর রুমে এ ঘটনা ঘটে। ওই রুমের কয়েকজন ছাত্রীর অভিযোগ, ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে না যাওয়ার কারণে কক্ষে এসে তাদের বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন রিভা। ভাইরাল হওয়ার পরই রিভা নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাস দিয়ে বিষয়টি স্বীকার করে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।

Edenগত ২৪ আগস্ট অডিও ফাঁসের ঘটনায় বেকায়দায় পড়ে ক্ষমা চাইলেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি রিভার। দুই ছাত্রীকে সাত ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন এবং নগ্ন ভিডিও ধারণ করে ভাইরাল করার হুমকির অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের এই নেত্রীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ছাত্রীরা গুরুতর এই অভিযোগ আনেন।

এদিকে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছাত্রীনিবাসের পাঠকক্ষের প্রবেশমুখে টেবিল বসিয়ে পড়ছিলেন ছাত্রলীগের এক কর্মী। এতে অন্য শিক্ষার্থীদের চলাচলে সমস্যা হওয়ায় এক ছাত্রী তাকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে ছাত্রলীগের ওই কর্মীর নেত্রী দলবল নিয়ে কক্ষে গিয়ে ওই ছাত্রীকে মানসিক নির্যাতন করেন। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের ওই নেত্রী তার পায়ে গরম চা ঢেলে দেন এবং তার হাত মচকে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতনে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেত্রী হলেন ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আয়েশা ইসলাম ওরফে মীম। তিনি ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন ওরফে রিভার অনুসারী।

Edenএসব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল শনিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সিট বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ করে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ায় সংগঠনের এক নেত্রীর ওপর চটেন সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানা। গত ২২ সেপ্টেম্বর ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের বিষয়ে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস। পরে ওই সাক্ষাৎকার দেখেই ক্ষুব্ধ হন তামান্না ও রাজিয়া।

এর জেরে শনিবার রাত ১১টার দিকে তাকে কলেজের ছাত্রীনিবাস থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন কলেজ শাখার নেত্রী নুজহাত ফারিয়া ওরফে রোকসানা, আয়েশা ইসলাম ওরফে মীম ও কামরুন নাহার ওরফে জ্যোতিসহ তামান্না ও রাজিয়ার কয়েকজন সমর্থক। এ সময় জান্নাতুলকে হেনস্তা ও মারধর করেন তারা।

ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সামিয়া আক্তার বৈশাখি নামে এক সাংগঠনিক সম্পাদক অভিযোগ তুলেন, সাধারণ মেয়েরা সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের কাছে সেইফটি ফিল করে না। কারণ তারা ব্যবসা করে। লিগ্যাল রুমের মেয়েরা যখন অ্যাটেন্ডেন্স খাতায় সাইন করতে আসে, তখন সভাপতির অনুসারী পোস্টেড মেয়েরা তাদের ছবি তুলে রাখে। কোন মেয়েটা সুন্দর, সেটা তারা সিলেক্ট করে রাখে। পরে তারা সেসব মেয়েকে রুমে নিয়ে যায়। রুমে নিয়ে গিয়ে হুমকি-ধামকি দিয়ে বিভিন্ন খারাপ কাজের প্রস্তাব দেয়।

Edenরাতের ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা। রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলের ওই হামলায় তাকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানার খোঁজ মিলেছে।  এখনও। রোববার কলেজে দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় মারধরে আহত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানা (২৮) ও ছাত্রলীগ কর্মী সুমি আক্তারকে (২৪) ঢাকা মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে পুলিশি পাহারায় তাদের ঢামেকের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। 

শনিবার রাতে মারধরের ঘটনা নিয়ে রোববার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে দুই গ্রুপের মধ্যে ওই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে সভাপতিসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। কলেজ অডিটোরিয়ামের সামনেই এই ঘটনা ঘটে।

ছাত্রলীগের তদন্ত কমিটি, একাংশের প্রত্যাখ্যান

শনিবার রাতের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রোববার সকালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার তদন্তে দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি তিলোত্তমা শিকদার এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেনজির আহমেদ নিশি।

যদিও তদন্ত কমিটি গঠনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ইডেন ছাত্রলীগের একাংশের নেত্রীরা।

Edenএদিকে, জান্নাতুল ফেরদৌসকে মারধরের ঘটনায় কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা এবং সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানার বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে গণপদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের ২৫ নেত্রী। রোববার বেলা সাড়ে ১২টায় ইডেন কলেজের শহীদ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছাত্রীনিবাস প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এই ঘোষণা দেন।

সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, আজকে হওয়া তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়েছে নিশি এবং তিলোত্তমাকে। এর আগে যখন রিভার অডিও ফাঁস হয়েছে সেটিরও তদন্ত করতে দেওয়া হয়েছে নিশি-তিলোত্তমাকে। তারা সেই তদন্তের কোনো রিপোর্ট আমাদের জানায়নি। নিশি আর তিলোত্তমার তদন্ত কমিটি আমরা মানব না। বারবার অপরাধ করেও কেন্দ্র থেকে ইডেন সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এবার যদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে আমরা এখানে উপস্থিত ২৫ জনই গণহারে পদত্যাগ করব।

এ সময় তারা ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানাসহ তদন্ত কমিটির দুই সদস্য তিলোত্তমা শিকদার ও বেনজীর আহমেদ নিশিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।

বিষয়টি নিয়ে বেনজীর আহমেদ নিশির সঙ্গে কথা হলে অবাঞ্ছিত ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, অবাঞ্ছিত ঘোষণা তো যে কেউ করতে পারে, কিন্তু এটা তো আমাদের সাংগঠনিক দায়িত্ব। তাই এটা আমাদের পালন করতে হবে। সংগঠনের বহির্ভূত কিছু করার এখতিয়ার আমাদের নেই। আর সকালের ঘটনাটি সম্পর্কে আমরা কথাবার্তা বলছি। এখনও কোনো পদক্ষেপ নেইনি। আমরা সুবিধামতো ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

Edenরিভার অডিও রেকর্ড ফাঁসের ঘটনার তদন্ত কমিটিতে থাকলেও কোনো প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ওই তদন্ত কমিটিতে আমাদের অফিসিয়ালভাবে কোনো নাম আসেনি। আমরা শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলাম। ওই ঘটনার তদন্ত আমরা করেছি। অফিসিয়ালি নাম আসেনি বিধায় আমরা লিখিত কিছু জমা দেইনি। আর যারা আমাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে বা বলেছে যে তদন্ত কমিটি মানে না, তারা কিন্তু ওই তদন্তের সময়ও আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করেনি। একটা ঘটনায় যে বা যাদের ফল্ট, তারা যদি ঠিকমতো সমন্বয় না করে তাহলে কিন্তু তদন্ত করাটা একটু কঠিন হয়ে যায়।

ছাত্রলীগের এই নেত্রী বলেন, একটা ঘটনার অন্তরালে কিন্তু অনেক কিছু থাকতে পারে। মরিয়ম মান্নানের ঘটনাটি উদাহরণ হিসেবে ধরতে পারেন। আমরা ইডেন কলেজে তদন্ত করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি ইডেন কলেজ আসলে কী। তো এই তদন্তে আমাদের সবকিছু ওকে আছে, কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অবগত আছেন। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা এটার প্রতিবেদন প্রকাশ করব।

তবে বিষয়টিতে তদন্ত কমিটির অন্য সদস্য তিলোত্তমা শিকদারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Edenকলেজ প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে এসব ঘটনার পেছনে কলেজ প্রশাসনের ব্যর্থতাকেও দায়ী করেছেন ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের একাংশ। তারা বলেছেন, কলেজ প্রশাসনের কাছে যেকোনো কাগজপত্র সত্যায়িত করতে গেলে ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানার সম্মতি ব্যতীত তারা সত্যায়িত করেন না। এছাড়া গত ২০ সেপ্টেম্বরের ছাত্রীর পায়ে চা ঢালার ঘটনায় কলেজ প্রশাসন আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে ছাত্রলীগের চাপে মিটমাট করেন বলেও তারা অভিযোগ করেছেন।

এ ব্যাপারে ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ সুপ্রিয়া ভট্টাচার্যকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারাও ফোন ধরেননি।

জেবি/আইএইচ