রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্র রাজনীতিতে যে কারণে ছাত্রীদের অনাগ্রহ 

ইরফান তামিম রাবি
প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:২৩ এএম
ছাত্র রাজনীতিতে যে কারণে ছাত্রীদের অনাগ্রহ 
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের জাতীয় ইস্যুগুলোতে ছাত্ররাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে ছাত্রদের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল ছাত্রীদেরও। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই চিত্র পাল্টে গেছে অনেকাংশে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিতে এখনও ছাত্রীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তা একেবারেই নগণ্য। এর জন্য সংশ্লিষ্টরা সামাজিক প্রেক্ষাপট, পারিবারিক বাধা, মূল্যায়ন না থাকা, নিরাপত্তাহীনতার মতো কারণগুলোকেই দায়ী করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রাঞ্জু বলেন, গত শতকের আশির দশক থেকে ২০১২-১৩ সাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিবিরের দখলে ছিল। তারা চায়নি ছাত্রীরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করুক। দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ না থাকায় নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। যা আমরা বিগত ১২ বছরে পুরোপুরি ওভারকাম করেত পারিনি। এছাড়া যোগ্যতা থাকা সত্বেও মেয়েদের ছাত্র সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে আনা হয় না। ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পারি না। ফলে ছাত্রীরা যখন দেখে তাদের যোগ্যতা থাকা সত্বেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া সামাজিকভাবে তাকে আড় চোখে দেখছে তখন ছাত্রীরা রাজনীতি থেকে সরে যায়। 
 
বিগত কয়েক মাস ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, কেবল ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে কিছু ছাত্রীর অংশ্রগহণ রয়েছে। তবে তারাও নিয়মিত না। সম্প্রতি ছয়টি ছাত্রী হলে কমিটি দেওয়ার পরেও হাতে গোনা ৫-৬ জনকে ছাড়া কাউকে কর্মসূচিতে দেখা যায় না। এছাড়া ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটিতে রাখা হয়নি কোনো ছাত্রীকে। ছাত্র অধিকার পরিষদের কমিটিতে আছে একজন। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোতে গড়ে একজনও নেই। এছাড়া সংগঠনগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যে কেবল ছাত্র ইউনিয়নের শীর্ষ পর্যায়ে একজন আছেন ছাত্রী। সামগ্রিকভাবে মেয়েদের অংশগ্রহণ ১ শতাংশেরও কম। নেতৃত্ব আরও নিম্নগামী।

কি বলছেন ছাত্রীরা

ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রীদের অনাগ্রের কারণ হিসেবে সাধারণ ছাত্রীরা বলছেন, মূল্যায়ন না করা, স্বজনপ্রীতি, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও পারিবারিক বাঁধাকে দায়ী করছেন।

আইন বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী তাসফিয়া রহমান বলেন, ছাত্র রাজনীতিতে অনাগ্রহের কারণ এখানে যোগ্য নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করা হয় না, স্বজনপ্রীতি বেশি। সভাপতি ও সম্পাদকের সাথে যার সম্পর্ক ভালো শুধুমাত্র তারাই ভালো নেতৃত্ব পায়। এছাড়া ছাত্র রাজনীতির প্রতি সবারই নেতিবাচক মনোভাব। কেউ ইতিবাচক কোনো মন্তব্য করে না। যেকারণে রাজনীতিতে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে অনেকে। তাছাড়া যাদের অধিকার নিয়ে ছাত্র রাজনীতি শুরু হয়েছিল সেই ছাত্ররাই রাজনীতির পরিবেশটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। এছাড়া মেয়েরা অনিরাপদ মনে করেন।

প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী তানজিলা আইরিন মনে করেন রাবির ছাত্র রাজনীতির অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে লবিং, স্বজনপ্রীতি বেশি। মেয়েদের কোনো নিরাপত্তা নেই। পরিবার থেকে অনুমতি দেয় না রাজনীতিতে আসার। সর্বোপরি রাজনীতির প্রতি সংকীর্ণ মনোভাব প্রকাশ করে।

সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা ছাত্রীরা কি বলছেন?
খালেদা জিয়া হল ছাত্রলীগের  সাধারণ সম্পাদক আজমিরা বিনতে ইসলাম শ্রেয়া বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মেয়েদেরকে পারিবারিকভাবে ছেলেদের তুলনায় আগেই বিয়ে দেয়। কিন্তু ছাত্রসংগঠনগুলোতে বিবাহিত মেয়েদের পদ দেওয়া হয় না। এছাড়া পারিবারিকভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়। কমিটিতে ছাত্রদের অগ্রাধিকার বেশি দেওয়া হয় বলে মেয়েরা রাজনীতিতে আসতে চায় না।

মন্নুজান হল ছাত্রলীগের সভাপতি জান্নাত জানা বলেন, ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের রাজনীতি না করার নেপথ্যে আসল কারণ হলো, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও পারিবারিক চাপ। অধিকাংশ পরিবারই মেয়েদের রাজনীতিতে আসতে অনুৎসাহিত করে। তাদের ধারণা  রাজনীতি করলে মেয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে না। সমাজের মানুষ নেতিবাচকভাবে দেখবে। এছাড়া অনেকের আগ্রহ থাকলেও হাতে গোনা কয়েকজন ছাত্রী রাজনীতি করতে আসলে অস্বস্তিবোধ হয়। ফলে তারা নিজেদের গুটিয়ে রাখে।

ছাত্র ইউনিয়নের রাবি সংসদের সভাপতি শাকিলা খাতুন বলে, আমরা (ছাত্রীরা) যারা এখন রাজনীতি করছি, খোঁজ নিলে দেখা যাবে সবার পরিবারই প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িত। পরিবার আমাদের রাজনীতি করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু ক্যাম্পাসে অনেক ছাত্রী আছে যারা রাজনীতি করতে আগ্রহী কিন্তু পরিবারের সাপোর্ট না পাওয়া ও সমাজের আড় চোখে তাকানোর ভয়ে রাজনীতি থেকে দূরে সরে আছে।  

কি বলছেন শীর্ষ নেতারা
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, আসলে মেয়েদের কিছু পারিপার্শ্বিক বাধ্যবাধকতা থাকে। সেটা আমরা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। আমরা হলগুলোতে পাঁচ-সাত সদস্যের কমিটি দিয়েছি। এছাড়া আমার মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি ছাত্ররাজনীতির জন্য মেয়েদের বিষয়গুলো প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করে সহযোগিতা করে তাহলে তারা আরও ছাত্ররাজনীতে আগ্রহী হবে। এছাড়া  মেয়েদের হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতিকে নিরুৎসাহিত করতে দেখা যায় হল প্রশাসনকে। এই চর্চাটা বন্ধ করে দেওয়া উচিত এবং সবাইকে মুক্তচর্চার ও সমান অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করা উচিত। তাহলে ছাত্ররাজনীতিতে মেয়েদের পিছিয়ে পড়ার হার কমবে বলে আমার মনে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব সানিন চৌধুরী বলেন, ছাত্ররাজনীতিতে মেয়েদের অনাগ্রহের কারণ হচ্ছে সরকারি ছাত্রসংগঠন গুলোর তৈরি করা প্রতিবন্ধকতার জন্য। একজন মেয়ে শিক্ষার্থী যদি বিরোধী ছাত্রসংগঠন করে তখন সরকারি ছাত্রসংগঠন সেক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে। মূলত এই সমস্যার কারণেই মেয়েরা ছাত্র রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অনেক অনুসারী আছে কিন্তু সরকারি ছাত্রসংগঠন গুলোর ডিস্টার্বের কারণে তারা তা করতে পারে না। এই নিরাপত্তাহীনতা সবচেয়ে বড় কারণ বলে আমি মনে করি।

তিনি আরও বলেন, রাজনীতিতে অনেক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বর্তমান সময়ে আমরা সেই সুস্থ পরিবেশ পাচ্ছি না। আমরা প্রায়শই আমাদের যেসকল বোন সক্রিয় রাজনীতি করে তাদেরকে ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসী ও পুলিশের দ্বারা নির্যাতিত হতে দেখি। আমরা তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছি না। এসব দেখে পরিবার থেকে বারণ করে রাজনীতিতে আসতে। এছাড়া সামাজিক প্রেক্ষাপট তো রয়েছে। তাই ছাত্রীরা রাজনীতিতে আসতে চান না বলে মনে করেন এই ছাত্র নেতা।

বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম। তিনি বলেন, আমাদের (রাবি) এখানে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ ছাত্রীই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। ফলে ছোট থেকে এরা পারিবারিক একটা অনুশাসনের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। সেই জায়গা থেকে তারা নিজের অধিকার বা অন্যের অধিকার নিয়ে কথা বলবেন এমন চিন্তাই করতে পারে না। আত্মকেন্দ্রীক চিন্তার কারণে রাজনীতির প্রতি বিমুখ রয়েছে। 

প্রতিনিধি/এএস