চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও আয়তনের দিক থেকে এটি সবচেয়ে বড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরুর কথা বলতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব সময়ে। ছাপ্পান্ন বছর আগে ১৯৬৬ সালের নভেম্বরের ১৮ তারিখে পাহাড় ও অরণ্যে ঘেরা নৈসর্গিক ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। ২৮ তারিখে ইংরেজি, বাংলা, ইতিহাস ও অর্থনীতি- মাত্র এই চারটি বিভাগে ক্লাস শুরু হয়। অক্টোবর মাসের মধ্যে প্রত্যেক বিভাগে ২ জন করে ৪ বিভাগে শিক্ষক, রেজিস্ট্রার ও সহকারী লাইব্রেরিয়ান নিযুক্তির কাজ সম্পন্ন হয়। হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে ১০টি অনুষদ, ৪৮টি বিভাগ, ছয়টি ইন্সটিটিউশন, পাঁচটি গবেষণা কেন্দ্রসহ প্রায় ১২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী, এক হাজার শিক্ষক ও প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে আজকের এই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে ২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।এখানে রয়েছে চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ও বাংলাদেশের একমাত্র একাডেমিক জাদুঘর।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন বিশ্ববিখ্যাত বহু নামী-দামী ব্যক্তিত্বরা। যাদের মধ্যেপদার্থবিজ্ঞানী ড. জামাল নজরুল ইসলাম, ইতিহাসবিদ ড. আব্দুল করিম, জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান¸ নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস থেকে শুরু করে একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক আবুল মোমেন, লেখক অধ্যাপক আহমদ শরীফ, ড. আ ক ম আব্দুল কাদির, আলাউদ্দিন আল আজাদ ও ময়ূখ চৌধুরীর মতো ব্যক্তিবর্গরা।
এছাড়াও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটলের ঝকঝকা ঝক ধ্বনির সাথে পরিচিত ছিলেন সেনা প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও বিজিবি প্রধান জেনারেল আবুল হোসেন থেকে শুরু করে গভর্নর ফজলে কবির, মেয়র আনিসুল হক, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, কবি আসাদ মান্নান, লেখক হরিশংকর জলদাস ও সংগীতশিল্পী আইয়ূব বাচ্চুর মতো গুণীজনরা।

প্রতিষ্টার পর থেকে এই ছাপ্পান্ন বছরের পরিক্রমায় বিশ্ববিদ্যালয়টি হয়ে আছে বাঙলা, বাঙালি ও বাংলাদেশিদের বহু ইতিহাসের অনন্য দৃষ্টান্ত। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে স্বমহিমায় তুলে ধরার অঙ্গীকার নিয়ে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
এমনকি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে লেগে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কিছু অমর গাঁথা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আগে এই বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ উপাচার্য ড. এ. আর মল্লিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন শিক্ষক, ১১ জন ছাত্র এবং ৩ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী শাহাদাতবরণ করেন। যুদ্ধে বীরত্বের ‘বীর প্রতীক’ খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিও রয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রকৌশল দপ্তরের কর্মচারী মোহাম্মদ হোসেন।

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের উপাচার্য ও সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'সামরিক শাসক (তৎকালীন পাকিস্তান সরকার) পূর্ব পাকিস্তানে আরও একটি বিশ্ববিদ্যালয় দিতে রাজি হয়েছিলেন শুধুমাত্র এই কারণে যে, পশ্চিম পাকিস্তানে তখন অনেক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলো, কিন্তু এমন এক জায়গায়, যা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে, তখনকার সময়ে প্রায় একটি অগম্য স্থানে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়টি যাঁর পরামর্শে ও বুদ্ধিতে এখানে স্থাপিত হয়েছিল তিনি হলেন প্রয়াত ফজলুল কাদের চৌধুরী, আইয়ুব খানের পার্লামেন্টের স্পিকার। ফজলুল কাদের আইয়ুব খানকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এখানে বিশ্ববিদ্যালয় হলে ছাত্রদের আন্দোলন শহরকে স্পর্শ করবে না। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট আন্দোলন, ৬২-৬৩ সালের শরীফ শিক্ষা কমিশন বিল বাতিল আন্দোলন, মার্শাল ল বিরোধী আন্দোলন, ৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন-সব আন্দোলনেরই প্রাণকেন্দ্র ছিল ছাত্ররা। মুখ্যত ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।'
তবুও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই অগম্য স্থান থেকেও স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। জনসাধারণের মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন। হয়েছেন শহীদ। আজকের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এতো এতো শিক্ষার্থী, এতো এতো ভবন, গ্রন্থাগার, জাদুঘর, স্মৃতিচিহ্ন, খেলার মাঠ, সুন্দর সুন্দর রাস্তা-ঘাট, আনন্দঘন উন্মুক্ত পরিবেশ। অথচ, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিলো না তেমন কোনো ভবন, ক্লাসরুম বা স্থাপনা।

ড. এ আর মল্লিক (প্রথম উপাচার্য) প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের কথা এভাবে উল্লেখ করেন— ‘১৯৬৫ সালের ৩ ডিসেম্বর আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা এবং পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করি। অফিস-কাম-রেসিডেন্স হিসেবে চট্টগ্রাম শহরস্থ নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির কাজে আমি আত্মনিয়োগ করেছিলাম। আসবাবপত্রের অভাবে আমার ডাইনিং চেয়ার ও টেবিল দ্বারাই অফিসের কাজ শুরু হয়েছিল। এ সময় সকাল সাড়ে সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত আমাদেরকে প্রায় একটানা কাজ করতে হতো।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘স্বল্পতম সময়ের ভেতর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ ছাত্র ভর্তি ও ক্লাস শুরু করাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। এ কারণে সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে একাডেমিক ভবন, গ্রন্থাগার ভবন, অফিস ভবন, শিক্ষক নিবাস, ছাত্রদের হল ইত্যাদি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। যতদূর জানি, পুরাতন প্রশাসনিক ভবন ও খেলার মাঠ সংলগ্ন এলাকায় নির্মিত এসব ভবন বর্তমানে মেডিক্যাল সেন্টার, প্রকৌশল দফতর, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ইত্যাদির ব্যবহৃত হচ্ছে। কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।’

‘১৯৬৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ওই দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে প্রথম উপাচার্য পদে নিয়োগ দানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী মাসের ৯ অক্টোবর উপাচার্য পদে আমি যোগদান করি। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, অর্থনীতি-এ চারটি বিভাগের ২০০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ১৯৬৬ সালের ২৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ শুরু হয়’—যুক্ত করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতি নিয়ে ড. আনিসুজ্জামানের ভাষায়, ‘১৯৭১ সালে উপাচার্য ড. মল্লিকের নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি। চট্টগ্রামের সামরিক পরিস্থিতি আমাদের প্রতিকূলে চলে গেলে ৩১ মার্চ ও ১ এপ্রিল আমরা সুসংগঠিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ত্যাগ করি। পরে ড. মল্লিক, অধ্যাপক আলী আহসান এবং আরও অনেক শিক্ষক নিরাপত্তার সন্ধানে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। আমিও তাই করি। সেখানে সর্বস্তরের শরণার্থী শিক্ষকদের নিয়ে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি গঠিত হলে ড. মল্লিক তার সভাপতি এবং আমি তার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। এই সমিতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারকার্যে অংশ নেয় এবং শিক্ষকদের কল্যাণসাধনে চেষ্টিত হয়।’
প্রতিনিধি/এইচই




