শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

অধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল হোম ইকোনমিকস কলেজ, ফের সড়ক অবরোধ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

শেয়ার করুন:

অধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল হোম ইকোনমিকস কলেজ, ফের সড়ক অবরোধ

রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সে (সাবেক হোম ইকোনমিকস কলেজ) অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে। 

বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত বিক্ষোভের পর শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল থেকে আবারও কলেজের সামনের সড়ক অবরোধ করেছেন তারা। 

অধ্যক্ষের পদত্যাগের পাশাপাশি আগের রাতে পুলিশের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মারধরের যে অভিযোগ উঠেছে, তার তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। দাবি পূরণে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন তারা।

শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে কলেজের সামনে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। পরে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় ‘ক্যাম্পাসে পুলিশ কেন, জবাব চাই’, ‘আমার বোন আহত কেন, জবাব চাই’ প্রভৃতি স্লোগান দেন তারা।

7

আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাদের দাবি দুটি। প্রথমত, কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছাকে পদত্যাগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৃহস্পতিবার রাতে ক্যাম্পাস ও ছাত্রীদের আবাসিক হলে পুলিশের প্রবেশ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, অধ্যক্ষের পদত্যাগের লিখিত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তাকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে কলেজের নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত কতদূর এগিয়েছে, তা আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জানানোর দাবিও তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তারা কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করেন। দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকার পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে।

অধ্যক্ষকে উদ্ধারের সময়েই পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুলিশ কয়েকজন ছাত্রীর চুল ধরে টেনেছে, সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় মারধর করেছে এবং লাঠিচার্জ করেছে। আবাসিক হলের ভেতরেও ছাত্রীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলেছেন তারা।

শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন থেকে চারজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এক ছাত্রী পুলিশের পায়ের নিচে চাপা পড়ে আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই ছাত্রীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া কয়েকজনের মোবাইল ফোন ও পরিচয়পত্র পুলিশ নিয়ে গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুই শিক্ষার্থীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না দাবি করে তাদের আটক করা হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারীরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

8

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে অধ্যক্ষকে উদ্ধারের পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। শতাধিক শিক্ষার্থী কলেজের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যান। রাত আড়াইটা পর্যন্ত তাদের সেখানে অবস্থান করতে দেখা যায়। পরে শুক্রবার সকালে আবার কর্মসূচি শুরু হয়।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যক্ষের আচরণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকেই তাদের প্রতিবাদ। এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার অভিযোগ ওঠার পর আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে।

তবে শুক্রবার কলেজে নির্ধারিত চাকরির পরীক্ষা অনুষ্ঠানে বাধা না দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা। চাকরিপ্রার্থীদের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা চলতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও অধ্যক্ষের ক্যাম্পাসে প্রবেশের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেননি আন্দোলনকারীরা।

বিদায় অনুষ্ঠান ঘিরে বিরোধের শুরু

কলেজে চলমান আন্দোলনের সূত্রপাত পূজার ছুটির আগে আয়োজিত একটি বিদায় অনুষ্ঠান থেকে। কলেজের তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিলেন।

শুরুতে রাত ১০টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেওয়া হয়। পরে শিক্ষার্থীদের আবেদনে সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা করা হয়। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হতে ভোর ৫টা বেজে যায়।

এ ঘটনায় অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্বে থাকা দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেছা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরে ওই দুজন ক্ষমা চাইতে গেলে আসন ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত হিসেবে অডিটোরিয়ামের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা দাবি করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। একপর্যায়ে তারা অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবি তোলেন।

তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সঙ্গে একমত নন অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের অনেক বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠান চালানোয় শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়টি সামনে আসে। প্রথমে দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষার্থীরা যা বলছে, তা ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমি ওদের একটা অনুষ্ঠান করার অনুমতি দিয়েছিলাম রাত ১২টা পর্যন্ত। ওরা ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করেছে। অনুষ্ঠান করার প্রেক্ষিতে আমি একটু রেগে গিয়ে ওদের দুইজনের আসন বাতিল করে দিয়েছি।

পরে শিক্ষার্থীরা ক্ষমা চাইলে আসন বাতিলের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নমনীয় হন বলে জানান তিনি। তবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিল আদায়ের সিদ্ধান্তকে শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে অধ্যক্ষ বলেন, তারা সাদা কাগজে আমাকে পদত্যাগের স্বাক্ষর করতে বলছে। আমি কেন তাদের কাছে পদত্যাগ করব?

এদিকে অধ্যক্ষের এই অবস্থানের মধ্যেই শুক্রবার নতুন করে সড়কে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অধ্যক্ষের অবিলম্বে পদত্যাগ এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ও বিচারের বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

এমএইচ/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর