সকালের নরম আলোয় গাছের পাতার ফাঁক গলে রোদ এসে পড়ে পথের ওপর। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল—সময়ের সঙ্গে বদলে যায় দৃশ্যপট। ব্যস্ত পায়ে শিক্ষার্থীরা ছুটে যান ক্লাসে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গল্পে মেতে ওঠেন, কেউ আবার প্রিয়জনের সঙ্গে কাটান একান্ত কিছু মুহূর্ত। এমন অসংখ্য দৃশ্যের নীরব সাক্ষী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট থেকে শেরে বাংলা ফজলুল হল পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক। দৈর্ঘ্যে খুব বেশি না হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অসংখ্য স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এর নাম। ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব, হাসি-কান্না, একাকিত্ব কিংবা জীবনের নানা বাঁক—কত বিচিত্র অভিজ্ঞতার যে সাক্ষী এই পথ, তার হিসাব মেলানো কঠিন।
দুই পাশে সারি সারি গাছ, ছায়াঘেরা পথ, সবুজের সমারোহ আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে প্যারিস রোড যেন ক্যাম্পাসের এক অনন্য সৌন্দর্য। এখানে পথ শুধু গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না, বরং তৈরি করে অসংখ্য স্মৃতি ও গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও একটু থেমে দাঁড়ানো, নিজের মতো করে সময় কাটানো কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে কিছু মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে এটি বিশেষ এক ঠিকানা।

বিকেল হলেই জমে ওঠে আড্ডা
বিকেল নামতেই প্যারিস রোড যেন ফিরে পায় নতুন প্রাণ। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের আড্ডা, বন্ধুদের হাসি-ঠাট্টা, ছবি তোলা কিংবা নিছক হাঁটাহাঁটিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কেউ আসে মনের কথা বলতে, কেউ দিনের ক্লান্তি দূর করতে। আবার কারও কাছে এই পথ একান্তই নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর জায়গা।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় প্রতিদিন সরব থাকে প্যারিস রোড। ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের কাছেও এটি অন্যতম আকর্ষণ। অতিথিরা এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন, আর শিক্ষার্থীদের কাছে এটি হয়ে ওঠে স্মৃতি জমিয়ে রাখার এক বিশেষ জায়গা।

বর্ষায় অন্যরকম প্যারিস রোড
ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় প্যারিস রোডের রূপও। বর্ষার বৃষ্টিতে ভেজা পাতা আর সিক্ত পথ তৈরি করে অন্য রকম আবহ। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দে মেতে ওঠেন, কেউ আবার গাছের নিচে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন বৃষ্টির সৌন্দর্য। হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টিতে পথচারীদের ছোটাছুটি, কিংবা ইচ্ছা করেই বৃষ্টিতে ভিজে চলা—সব মিলিয়ে বর্ষায় প্যারিস রোড হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের বৃষ্টিবিলাসের অন্যতম ঠিকানা।
শরতের নির্মল আকাশ, শীতের কুয়াশা কিংবা বসন্তের রঙিন প্রকৃতি—প্রতিটি ঋতুতেই এই সড়ক যেন হাজির হয় নতুন সাজে। গাছপালার সবুজ আর প্রকৃতির বৈচিত্র্য প্যারিস রোডের সৌন্দর্যকে দেয় ভিন্ন মাত্রা।

ছোট ছোট মুহূর্তেই জমে স্মৃতির ভাণ্ডার
ক্যাম্পাসের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে প্যারিস রোডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ব্যক্তিগত স্মৃতি। প্রথমবার বন্ধুর সঙ্গে হাঁটা, ক্লাস শেষে দীর্ঘ আড্ডা, বিশেষ কোনো দিনের ছবি কিংবা নিছক বিকেলের হাঁটাহাঁটি—ছোট ছোট এসব মুহূর্তই সময়ের সঙ্গে হয়ে ওঠে অমূল্য স্মৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ হয়ে গেলেও তাই প্যারিস রোডের কথা সহজে ভোলার নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবির রাব্বি অঙ্কন বলেন, ‘প্যারিস রোডে হাঁটলে মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ততার মাঝেও একটু নিজের মতো করে সময় কাটানো যায়। বন্ধুদের সঙ্গে এখানে কাটানো সময়গুলো পরে হয়ত সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে।’

রাজশাহীর পবা থেকে ঘুরতে আসা এক দর্শনার্থী বলেন, ‘প্যারিস রোড শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বাইরের দর্শনার্থীদের জন্যও আকর্ষণীয় একটি জায়গা। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে গাছপালা আর ভেজা রাস্তার দৃশ্যটা অসাধারণ লাগে। এখানে কিছু সময় কাটালে শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকার অনুভূতি পাওয়া যায়।’
দিন শেষে যখন ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে আসে, তখনও প্যারিস রোড দাঁড়িয়ে থাকে নিজস্ব সৌন্দর্যে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা শেষ বিকেলের আলো, পথের ওপর দীর্ঘ ছায়া আর নীরবতার মধ্যে হেঁটে যাওয়া কয়েকজন মানুষ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় অন্য রকম এক আবহ।

যেভাবে প্যারিস রোডের যাত্রা
প্যারিস রোডের সৌন্দর্যের পেছনে রয়েছে বৃক্ষরোপণের এক ইতিহাস। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে গগনশিরীষগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন উপাচার্য এম শামসুল হক ফিলিপাইন থেকে কিছু গাছ নিয়ে আসেন। পরে সেগুলো রোপণের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী মোহাম্মদ ইউনুসকে। তার হাত ধরেই গাছগুলো রোপণ করা হয়। শুরুতে এটি ছিল সৌন্দর্যবর্ধনের একটি উদ্যোগ, যা সময়ের সঙ্গে ক্যাম্পাসের অন্যতম পরিচিত স্থানে পরিণত হয়েছে।
_20261102_100247976.jpg)
প্যারিস রোডের নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা জনশ্রুতি। প্রচলিত একটি গল্প অনুযায়ী, এক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের কিছু ছবি তুলে তার এক বন্ধুকে পাঠান। ছবিগুলো দেখে বন্ধু বিস্মিত হয়ে জানতে চান, এগুলো কোন দেশের ছবি। জবাবে শিক্ষার্থী জানান, এটি তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছবি। সেই ছবিগুলোর মধ্যে প্যারিস রোডের ছবিও ছিল বলে কথিত আছে।
আরেকটি জনশ্রুতি হলো, ১৯৮০-এর দশকে ‘রোড টু সোয়াদ’ কিংবা ‘রোড টু প্যারিস’ নামের চলচ্চিত্রে দেখানো রাস্তার সঙ্গে এই সড়কের মিল থাকায় এর নাম প্যারিস রোড হয়েছে। তবে নামকরণের এসব গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র প্রয়োজন।

শুধু রাস্তা নয়, প্রজন্মের স্মৃতির ক্যানভাস
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থানের মধ্যে প্যারিস রোডের অবস্থান আলাদা। এটি কেবল একটি সড়ক নয়, বরং ক্যাম্পাসজীবনের নীরব সাক্ষী। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এর ওপর দিয়ে হেঁটে যান, অথচ প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কারও কাছে এটি বন্ধুত্বের স্মৃতি, কারও কাছে ভালো লাগার জায়গা, আবার কারও কাছে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিকেলগুলোর ঠিকানা।
সময় এগিয়ে যায়, শিক্ষার্থীরা আসেন-যান, বদলে যায় প্রজন্ম। কিন্তু প্যারিস রোড থেকে যায় নতুন মানুষকে স্বাগত জানিয়ে, নতুন গল্পের অপেক্ষায়। হয়ত এ কারণেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড শুধু একটি পথ নয়; এটি এমন এক ক্যানভাস, যেখানে প্রতিদিনই লেখা হয় নতুন নতুন গল্প।
প্রতিনিধি/এসএস




