সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

তারেক রহমানের প্রতিনিধি সম্মেলনের রিপোর্ট করেই কি বিপাকে চবি শিক্ষক?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, চবি
প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩৭ পিএম

শেয়ার করুন:

তারেক রহমানের প্রতিনিধি সম্মেলনের রিপোর্ট করেই কি বিপাকে চবি শিক্ষক?

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রতিবেদক হিসেবে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন প্রতিনিধি সম্মেলনের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক মো. শাহ্ আলম। সে সময় তরুণ, সাহসী, উদ্যমী ও মেধাবী প্রতিবেদক হিসেবে তিনি দেশজুড়ে পরিচিতি পান ‘শাহ্ আলম বাংলাদেশ টেলিভিশন’ নামে। ২০০৫ সালে বিটিভিতে ‘সময়ের সংলাপ’ নামে একটি টকশোও শুরু করেন তিনি।

একই বছরের ১৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন শাহ আলম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর—উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি স্বর্ণপদকও লাভ করেন বলে জানা গেছে।

তবে শিক্ষকতায় যোগ দেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই রাজনৈতিক পরিচয় ও পেশাগত কর্মকাণ্ডের কারণে নানা হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন শাহ আলম। তার দাবি, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাকে বিভিন্নভাবে চাপের মুখে পড়তে হয়। এমনকি একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রয়াত অধ্যাপক আবু ইউসুফ আলমের অসন্তোষের কারণে সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

শাহ আলমের অভিযোগ, বিটিভিতে কর্মরত অবস্থায় সরকারের সমালোচনামূলক বিভিন্ন সংবাদ প্রচার করায় তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন তৎকালীন উপাচার্য। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের চিরাচরিত নিয়ম ও চরিত্র অনুসারে, তারা কাউকে ফাঁসাতে চাইলে আগে তাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করত। এরপর তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসত।”

তিনি আরও বলেন, “মরহুম আবু ইউসুফ আলম উপাচার্য হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বিভাগে বিরোধী দল ও ভিন্নমতের শিক্ষকদের চাকরি যাওয়ার হিড়িক শুরু হয়। তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের চাকরি চলে যায়।”

29

চাকরিচ্যুতির ঘটনায় শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় বলে জানান শাহ আলম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। পরে মৌখিকভাবে তাঁকে বিভাগে যোগদানের কথা জানানো হলেও প্রায় এক বছর বেতন-ভাতা ছাড়াই তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ওই সময়ের বকেয়া বেতন-ভাতাও তিনি পাননি বলে দাবি করেন।

ওই সময় বিভাগের পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন শাহ আলম। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই ডিপার্টমেন্ট ছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের আতঙ্ক।” তাঁর অভিযোগ, বিভাগের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল। তাদের মতের বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিলে, এমনকি নিজ রাজনৈতিক বলয়ের লোক হলেও তাঁকে ছাড় দেওয়া হতো না। ভিন্নমত পোষণকারীদের নানাভাবে হয়রানি ও চাপে রাখা হতো বলেও দাবি করেন তিনি।

শাহ আলমের ভাষ্য, বিএনপিপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি এবং জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তাঁর পেশাগত জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বিএনপির ইউনিয়ন প্রতিনিধি সম্মেলনের সংবাদ বিটিভিতে প্রচার করার বিষয়টিও তাঁর বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাব তৈরির কারণ হয়েছিল বলে মনে করেন তিনি।

শাহ আলমের অভিযোগ, ২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেন তিনি। তাঁর দাবি, পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও তাঁর আবেদন যথাযথভাবে বিভাগের পরিকল্পনা কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। এদিকে তাঁর জুনিয়র সহকর্মীদের পদোন্নতি দেওয়া হলেও তাঁর আবেদন বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়। দীর্ঘ চার বছর এভাবে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলে অভিযোগ তাঁর।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সেকান্দর চৌধুরী তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁর পদোন্নতি দেওয়া হলে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অসন্তুষ্ট হতে পারেন। এ কারণে তাঁর পদোন্নতির বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন শাহ আলম।

এ ছাড়া উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যাওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত করা, বেতন আটকে রাখা এবং তাঁর বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ তুলে হয়রানি করারও অভিযোগ করেন তিনি। এসব ঘটনার কারণে দীর্ঘদিন মানসিক চাপে ছিলেন বলে জানান শাহ আলম। তাঁর দাবি, এই মানসিক চাপের মধ্যেই তিনি দুইবার স্ট্রোক করেন। প্রথমবার ভারতে এবং পরবর্তী সময়ে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসা নিতে হয় তাঁকে।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান শাহ আলম। তবে তাঁর দাবি, নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি না পাওয়ায় যে আর্থিক ও পেশাগত ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো পূরণ হয়নি। এ কারণে পদোন্নতির চার বছরের বিলম্বের ক্ষতিপূরণ চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন তিনি।

তবে শাহ আলমের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সেকান্দর চৌধুরী। তিনি বলেন, পদোন্নতি দেওয়া বা আটকে রাখার একক ক্ষমতা তার ছিল না। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ছিল।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, শাহ আলম ২০২০ সালে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। তবে সে সময় তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাঁকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষকতার দীর্ঘ কর্মজীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিলম্বের অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শাহ আলম। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও পেশাগত কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে যে হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে, তার যথাযথ প্রতিকার এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত।

/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর