ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) পঞ্চম সমাবর্তনে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন ফি ৫ হাজার ও সনদ উত্তোলনের জন্য অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আগামী ৫ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন চলবে। তবে নির্ধারিত ৬ হাজার টাকা ফি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মারফতে ৫ম সমাবর্তনে রেজিস্ট্রেশন ফি সম্পর্কে জানতে পেরে একে ‘অতিরিক্ত’ বলে আখ্যায়িত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা।
তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সমাবর্তনের ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ ও ফি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের মতে, অনার্স-মাস্টার্সের মূল কাগজপত্র উত্তোলনে আগে থেকেই অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এরপর সমাবর্তনের জন্য অতিরিক্ত ৬ হাজার টাকা অনেকের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা ও বেকার শিক্ষার্থীদের জন্য এ ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে।
৪র্থ সমাবর্তনের তুলনায় এবার নিবন্ধন ফি ২০০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ৪র্থ সমাবর্তনের মূল নিবন্ধন বা সমাবর্তন ফি ছিল ৩,০০০ টাকা। তবে যে-সব শিক্ষার্থী দুইয়ের অধিক সনদের (Certificate) জন্য আবেদন করেছিলেন, তাদের অতিরিক্ত ফিসহ সর্বমোট ৪,০০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩তম সমাবর্তনে যেখানে ব্যাংক চার্জসহ মূল সনদ ও নিবন্ধন ফি বাবদ সর্বমোট ৩৩২০ টাকা নেওয়া হয়েছিল, সেখানে ইবিতে প্রায় দ্বিগুণ ফি ধার্য করায় শিক্ষার্থীরা একে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা হিসেবে দেখছেন।
অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করলেও ইবির ৫ম সমাবর্তনের রেজিস্ট্রেশন ফি তুলনামূলক বেশি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সমাবর্তনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ২৫০০ টাকা এবং উভয় ডিগ্রি একসঙ্গে ৪০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তনে স্নাতক/স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ৩০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং পিএইচডি/এমফিল ইত্যাদি ডিগ্রির ক্ষেত্রে ৫০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অষ্টম সমাবর্তন অনুষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ স্নাতক পর্যায়ে ১৫০০ টাকা, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ২০০০ টাকা এবং পিএইচডি পর্যায়ে ৪০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ সমাবর্তনে স্নাতক/স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ৩০০০ টাকা এবং দুটি প্রোগ্রামের ডিগ্রি একই সঙ্গে ৪৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী ২৩ জানুয়ারি ২০২৭ অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় সমাবর্তনের রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০০০ টাকা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৮-১৯ বর্ষের শিক্ষার্থী হাসানুল বান্না অলি বলেন, সমাবর্তন একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। কিন্তু আসন্ন পঞ্চম সমাবর্তনে নির্ধারিত অতিরিক্ত ফি বেকার ও সদ্য স্নাতক শিক্ষার্থীদের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। ফলে অনেকেই অর্থের অভাবে জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের আবেগকে পুঁজি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জায়গা নয়। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অবিলম্বে ফি পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষার্থীবান্ধব ও যৌক্তিক ফি নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছি।
আল-ফিকহ এণ্ড ল বিভাগের ২০১৯-২০ বর্ষের শিক্ষার্থী নিয়ামতুল্লাহ মুনিম বলেন, সমাবর্তন একটি বিশাল আয়োজন। এটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হওয়া জরুরি ছিল। রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা যেত। অথচ কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই এত টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি মনে করি, এটি প্রশাসনের একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় অংশীজন শিক্ষার্থীরা। তাদের সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সমাবর্তনে কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হবে এবং শিক্ষার্থীদের কী কী উপকরণ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রকাশ করা প্রয়োজন। অন্যথায় এ আয়োজনকে নিছক ব্যবসা মনে করার অবকাশ থাকে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য শিক্ষার্থীরাও নির্ধারিত ফি নিয়ে ক্ষোভ এবং অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের কেউ কেউ সমাবর্তনে অংশগ্রহণ না করেও সহজে সনদ সংগ্রহের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
আল-হাদিস এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল মুন্তাকিম আল-মারুফ বলেন, গত ১০ বছরের সবচেয়ে বড় ‘বিজনেস প্ল্যান’ যেন এই সমাবর্তন। বরাদ্দ ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ার পরও এত ফি কেন? সাময়িক সনদ তুলতেই ২ হাজার টাকা, আবার মূল সনদে ১ হাজার! গ্র্যাজুয়েট মানেই লাখ টাকা আয় করে, তাই যত খুশি ফি আদায় করো! মানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে টাকা নেওয়ার নামই বিশ্ববিদ্যালয়!
আব্দুল জাবের শেখ নামে এক শিক্ষার্থী জানান, এই অ্যামাউন্টের কারণে অনেক ভাই-বোন ইচ্ছে থাকলেও অংশগ্রহণ করতে পারবে না। একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এত টাকা সমাবর্তন ফি ধরা উচিত না। যেহেতু এই সমাবর্তনকে উদ্দেশ্য করে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে সহপাঠীরা একত্রিত হয় তাই যৎসামান্য ধরা উচিত যেন সবাই আনন্দচিত্তে অংশগ্রহণ করতে পারে।
সাকিবুর রহমান দিহান নামে আরেক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রেজিস্ট্রেশন ফি শুনে তো মনে হচ্ছে, এতদিন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। সমাবর্তন প্রশাসন একাই করুক, আমি জাস্ট আমার সার্টিফিকেটগুলো চাই।
হাফিজুর রহমান হাফিজ নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, অনার্সের সাময়িক সনদপত্র-সহ সব কাগজপত্র তুলেছি। সমাবর্তনের পর ফি দিয়ে মূল সনদপত্র তুলবো। এমন সমাবর্তন দরকার নেই।
শিক্ষার্থীরা সমাবর্তনের সম্ভাব্য বাজেট ও ব্যয়ের খাত প্রকাশের পাশাপাশি ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ফি পুনর্নির্ধারণ করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সমাবর্তন রেজিস্ট্রেশন উপ-কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. ফারুকুজ্জামান খান বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় সমাবর্তনের রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণ করা হবে। তবে প্রশাসন স্পন্সর ম্যানেজ করলে ফি কমানো সম্ভব হয়। প্রাথমিক আলোচনার ভিত্তিতে একটা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে, এটাই চূড়ান্ত নয়। তাছাড়া রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ফি চূড়ান্ত হবে।
উল্লেখ্য, ইবির পঞ্চম সমাবর্তন আগামী ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতিনিধি/ এজে




