শিশু অধিকার সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধ এবং শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি বলেছেন, শিশুদের জন্য শুধু নীতি ও প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, এসব উদ্যোগ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ড. আমানুল্লাহ বলেন, ‘ডাটা বলছে, এ দেশের শিশুরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।’ জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ‘চাইল্ড ম্যারিজ চ্যাম্পিয়ন’ তৈরি করতে হবে। যারা বাল্যবিবাহ ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের কাজকে সমাজে মডেল হিসেবে তুলে ধরতে হবে। কারণ দেশে বাল্যবিবাহ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মিলনায়তনে ‘শিশুর স্বপ্নে ৫০ বছর: অর্জন, অভিজ্ঞতা ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে সম্মানিত আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’ স্লোগান সামনে রেখে শিশু অধিকার দিবস ২০২৬ ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে সমাজকল্যাণ ও মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ড. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এমপির সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সেলিমা রহমান।
দেশের শিশুদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরে ড. আমানুল্লাহ বলেন, অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার এখনো উদ্বেগজনক। দেশের ২৪ শতাংশ শিশু ভয়ানক অপুষ্টির শিকার। বস্তি ও উপকূলীয় এলাকার শিশুদের মধ্যে এ হার ৩৬ থেকে ৪৫ শতাংশ। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু সীসাদূষণে আক্রান্ত। কোনো কোনো শহরাঞ্চলে এ হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহারও এখনো ৩৩ শতাংশ।
শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া ও বাল্যবিবাহের চিত্র তুলে ধরে এই উন্নয়ন গবেষক বলেন, জাতীয়ভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হার ৮০ শতাংশ হলেও শহুরে বস্তিতে তা কমে ৭৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং উপকূলীয় এলাকায় ৭৮ থেকে ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হার প্রায় ৩৪ শতাংশ। শহুরে বস্তি ও উপকূলীয় অঞ্চলে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্নের হার ৩০ শতাংশের নিচে বা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
শিশুশ্রমের চিত্র তুলে ধরে ড. আমানুল্লাহ বলেন, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কর্মরত শিশুর সংখ্যা বেড়ে ৩৫ লাখে দাঁড়িয়েছে। শিশু শ্রমের হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। এরমধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছে। শহুরে বস্তিতে কর্মরত শিশুদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হওয়ার হার ৬০ শতাংশের বেশি।
বাল্যবিবাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশে ৪৭ থেকে ৫০ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় এ হার ৫৮ শতাংশের বেশি। দেশের প্রতি দুটি শিশুর মধ্যে একটি বাল্যবিবাহের শিকার। এতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ৮৬ শতাংশ শিশু বাড়ি বা বিদ্যালয়ে সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
ড. আমানুল্লাহ বলেন, শিশুদের সুরক্ষায় রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখাতে গিয়ে গত রাজনৈতিক সরকারের সময়ে এই পরিস্থিতি বেশি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে সমন্বিত ও ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিতে হবে। কারণ এসব সমস্যা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিকে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিশুদের নিয়ে দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় নেটওয়ার্ক কাজে লাগানোর কথা উল্লেখ করে ড. আমানুল্লাহ বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২ হাজার ৫০০ অধিভুক্ত কলেজে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। এই নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে শিশু অধিকার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশুশ্রম বন্ধ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরিতে দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব। এ কাজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের সদস্যদেরও শিশু একাডেমির সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
দেশের প্রথিতযশা এই শিক্ষাবিদ বলেন, একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য শুধু খাবার, পোশাক ও নিরাপত্তাই যথেষ্ট নয়। তার প্রয়োজন ভালোবাসা, যত্ন, সঠিক শিক্ষা, সুস্থ বিনোদন এবং নিজের কথা বলার সুযোগ। শিশুর অধিকারকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও সমানভাবে জড়িত।
সেমিনারে প্রধান আলোচক ছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ। স্বাগত বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রওশন আরা বেগম। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক ড. কামাল আহমেদ চৌধুরী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক মোছা. আরজু আরা বেগম।
প্রতিনিধি/এসএস




