গবেষণার নামে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা উপকরণ কেনার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি বলেছেন, প্রকল্পের টাকা খরচ করাই মূল বিষয় নয়, বরং সেই অর্থ দায়িত্বশীল ও অর্থবহভাবে ব্যয় করতে হবে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক গবেষণা প্রকল্পের জন্য একই ধরনের যন্ত্রপাতি বারবার কেনার প্রবণতাও বন্ধ করতে হবে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ইউজিসিতে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় চলমান ছয়টি গবেষণা উপপ্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, গবেষণা হোক, কিন্তু গবেষণার নামে অপ্রয়োজনীয় কিছু কেনার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। গবেষণার যথার্থতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণা হতে হবে দেশের কল্যাণে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের জন্য। গবেষণার অর্থ অর্থবহভাবে ব্যয় করতে হবে।
হিট প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে চলমান গবেষণা উপপ্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করছে ইউজিসি। প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, বাস্তবায়নের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি গবেষণার মান ও অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, কোনো উপপ্রকল্পে অস্পষ্টতা, বাস্তবায়নে জটিলতা কিংবা পরিকল্পনার ঘাটতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজনে প্রকল্প পুনর্নকশা, বাজেট যৌক্তিকীকরণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ নির্ধারণ এবং কাজের পরিধি ও সময়সীমা পুনর্বিন্যাসে সহযোগিতা করবে ইউজিসি। এ কাজে গবেষণা ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরও যুক্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, হিট প্রকল্পের এটিএফ কম্পোনেন্টের আওতায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান গবেষণা উপপ্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হবে। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা দেখা দিলে শুধু প্রধান গবেষককে দায়ী না করে ইউজিসি ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে সমন্বিতভাবে সমস্যার কারণ খুঁজে সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।
যবিপ্রবির ছয়টি গবেষণা উপপ্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনার পর ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিটি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মতভাবে শেষ করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। যেসব প্রকল্পে সংকট বা জটিলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা দেওয়া হবে। প্রকল্পের কার্যক্রম সময়মতো শেষ করতে ইউজিসি নিবিড়ভাবে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থের যৌক্তিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, অপ্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা কিংবা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের যন্ত্রপাতি একাধিক উপপ্রকল্পের আওতায় বারবার কেনার প্রস্তাব অর্থের অপচয়ের কারণ হতে পারে। গবেষণার প্রয়োজন ও সম্ভাব্য ফলাফল বিবেচনায় নিয়ে উপকরণ ও বাজেট নির্ধারণ করতে হবে। একই উপকরণ কেনার পুনরাবৃত্তি এড়ানো গেলে সীমিত অর্থ দিয়ে আরও বেশি গবেষণায় অর্থায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের টাকা খরচ করাটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়; দায়িত্ব নিয়ে এই টাকা অর্থবহভাবে খরচ করতে হবে।
একই ধরনের গবেষণা উপকরণ বারবার কেনা ঠেকাতে কেন্দ্রীয়ভাবে ক্রয় পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাহিদা সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় গবেষণা উপকরণ সমন্বিতভাবে কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য ক্রয় ও অডিট ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ক্রয় কমিটি গঠন করা হবে।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের গবেষণা উপকরণ বারবার কেনার প্রবণতা রয়েছে। এতে অর্থের অপচয়ের আশঙ্কার পাশাপাশি বিদ্যমান গবেষণা অবকাঠামো সমন্বিতভাবে ব্যবহারের সুযোগও কমে যায়। কেন্দ্রীয়ভাবে চাহিদা যাচাই করে উপকরণ কেনা হলে এ ধরনের পুনরাবৃত্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
পাশাপাশি কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাগার, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য গবেষণা সুবিধা প্রয়োজন অনুযায়ী একে অন্যের ব্যবহারের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তবে তাৎক্ষণিক ও অপরিহার্য কিছু উপকরণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কিনতে পারবে। গবেষকদের ক্রয় ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে মূল গবেষণায় বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য বলে জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান।
সভায় ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন, অর্থ, হিসাব ও বাজেট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আসলাম হোসেন, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর, হিট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামান, প্রকল্পগুলোর প্রধান গবেষক এবং ইউজিসি ও হিট প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এমএইচ/এফএ




