তরুণদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজে দক্ষ করে তুলতে সিলেটে কয়েকটি এআই ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, প্রথমে সিলেট থেকে এ কার্যক্রম শুরু করে পর্যায়ক্রমে বিভাগের অন্য জেলাগুলোয় সম্প্রসারণ করা হবে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের ফ্রিল্যান্সিং ও আন্তর্জাতিক আইটি খাতে কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ বাড়ানো হবে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) অডিটোরিয়ামে জালালাবাদ ছাত্রকল্যাণ সমিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নবীনবরণ ও বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘শুরুতে আমরা সিলেটে শুরু করব, তারপর বিভাগের অন্য জেলাগুলোয় নিয়ে যাব। এখানে আমরা কয়েকটি AI ট্রেনিং সেন্টার করব।’ দেশে, বিশেষ করে সিলেটে, ফ্রিল্যান্সিংয়ের বড় সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক তরুণ বর্তমানে মাসে ৫০০ থেকে শুরু করে ২ হাজার, ৪ হাজার কিংবা ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত আয় করছেন। উচ্চ পর্যায়ের কিছু ফ্রিল্যান্সারের আয় আরও অনেক বেশি।
এই সম্ভাবনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের লক্ষ্য উল্লেখ করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, AI প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন একঝাঁক তরুণ-তরুণীকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে তারা নিজেরাই উপার্জনে সক্ষম হবেন। ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজের মাধ্যমে তারা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনতে পারবেন এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আইটি-সংশ্লিষ্ট কাজ বাংলাদেশে নিয়ে আসতে পারবেন।
দেশের উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গবেষণায় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। বিশ্বের যেসব দেশ টেকসইভাবে এগিয়েছে, তাদের মৌলিক বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র ছিল স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবন।
তিনি বলেন, গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের পর্যায়ে যাওয়ার আগেই বাংলাদেশকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ দুই খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।
সরকারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকারের দুটি ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পর্যায়ক্রমে এ দুই খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রত্যেকটিতে জিডিপির ৫ শতাংশের সমপরিমাণ বিনিয়োগের লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তবে তিনি এটিকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এ পর্যায়ে পৌঁছানো সহজ নয় এবং এজন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে।
সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দেশের বিভাগভিত্তিক সাক্ষরতার হার ও শিক্ষার বিভিন্ন সূচকে সিলেট পিছিয়ে রয়েছে। শহর ও গ্রামীণ জনপদ—উভয় ক্ষেত্রেই জাতীয় গড়ের তুলনায় অঞ্চলটির অবস্থান প্রত্যাশিত নয়। বিদ্যালয়ের সংখ্যা, পাসের হার, প্রাথমিক শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের রিডিং ও নিউমেরেসি দক্ষতার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকার চিত্র রয়েছে।
তবে এ পিছিয়ে থাকার কারণ সিলেটের মানুষের মেধা বা সক্ষমতার ঘাটতি নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্তরাজ্য, উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা, রাজনীতি, ব্যবসা ও নানা পেশায় উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছেন। ফলে অঞ্চলটির শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়ার কারণ খুঁজতে হলে অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা, নেতৃত্ব ও অন্যান্য কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দিকে নজর দিতে হবে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গঠনে উচ্চশিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে কেবল ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, গবেষণা, উদ্ভাবন ও দেশ গঠনের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এমন দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের নিজেদের পাশাপাশি সমাজ ও দেশের জন্যও কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা তৈরি করবে। একই সঙ্গে বিদায়ী শিক্ষার্থীদের পেশাগত জীবনে সততা, দায়িত্বশীলতা ও দেশসেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জালালাবাদ ছাত্রকল্যাণ সমিতির কার্যক্রমের প্রশংসা করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় বসবাসরত সিলেট বিভাগের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ রাখার পাশাপাশি সিলেটকে এগিয়ে নিতে সংগঠনটি ‘আলোকবর্তিকা’ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্যে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি হওয়া সিলেট বিভাগের তিন জেলার নবীন শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন সফলভাবে সম্পন্ন করা কৃতি শিক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তা ও অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইউম চৌধুরী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. আলী মোহাম্মদ কাওছার, দৈনিক ‘আগামীর সময়’-এর সম্পাদক মোস্তফা মামুন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহদীন চৌধুরী ও ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ।
বক্তারা জালালাবাদ অঞ্চলের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নিজ অঞ্চলের শিক্ষা ও সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জালালাবাদ ছাত্রকল্যাণ সমিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ও সহসভাপতি শাকেরা বখস। এতে সমিতির বর্তমান ও সাবেক নেতাকর্মী এবং সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
এমআর/এআর




