টেকনাফের শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর করে শিক্ষার পরিবেশ ও মান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজারের টেকনাফ সরকারি কলেজ পরিদর্শন শেষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, টেকনাফের শিক্ষার্থীদের মেধা ও সম্ভাবনা আছে। কিন্তু তাদের সামনে সুযোগের পরিসর আরও বড় করতে হবে। একটি অঞ্চলের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন সেখানে শিক্ষার সুযোগ ও মান নিশ্চিত করা যায়। টেকনাফের শিক্ষাব্যবস্থার যে বেহাল দশা রয়েছে, তা পরিবর্তনে আমাদের সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।
ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, টেকনাফের মতো একটি সীমান্তবর্তী এলাকায় শিক্ষার সুযোগ যত বেশি বিস্তৃত হবে, এখানকার সামাজিক সমস্যাগুলোও ততটা কমবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থীর একমাত্র সরকারি কলেজটিতে গত ১৭ বছর ধরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। এই পরিস্থিতি আর চলতে দেওয়া যায় না। টেকনাফের শিক্ষার্থীদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, টেকনাফ সরকারি কলেজে স্থায়ী অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নেই, পর্যাপ্ত শিক্ষকসংকট, বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশের অভাব, আধুনিক লাইব্রেরি সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা না থাকাসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
অধ্যাপক আমানুল্লাহ বলেন, শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করলেই শিক্ষার দায়িত্ব শেষ হয় না। শিক্ষার্থীদের দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও কর্মমুখী করে তুলতে হবে। তাদের ভাষা শেখাতে হবে, প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করতে হবে, ক্যারিয়ার সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করতে হবে। আমরা টেকনাফ সরকারি কলেজকে এই সমন্বিত শিক্ষার পরিবেশের মধ্যে আনতে চাই।
তিনি আরও বলেন, দূরবর্তী মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ায় টেকনাফের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতিতেও। বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, মানব পাচার, বেকারত্ব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ঘিরে বিভিন্ন সামাজিক সংকটের মতো বিষয়গুলো মোকাবিলায় শিক্ষার প্রসারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই মৌসুমনির্ভর হওয়ায় তরুণদের একটি বড় অংশ স্থায়ী কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যাচ্ছে উল্লেখ করে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, আমাদের লক্ষ্য হবে টেকনাফের একজন শিক্ষার্থী যেন শুধু একটি সনদ নিয়ে কলেজ থেকে বের না হয়; বরং সে যেন নিজের যোগ্যতায় চাকরি করতে পারে, উদ্যোক্তা হতে পারে কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারে।
তিনি জানান, টেকনাফ সরকারি কলেজে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচি চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভাষাগত ও পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব ও ক্যারিয়ার ক্লাব চালু করা হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও আরও জোরদার করা হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, ক্যাম্পাসকে সবুজ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে গড়ে তুলতে ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি করে গাছ লাগাতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রচলিত বিষয়ের বাইরে কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে বিভিন্ন মাল্টিডিসিপ্লিনারি কোর্স, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কলেজের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, কলেজে আইসিটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক আছেন, কিন্তু শুধু শিক্ষক থাকলেই হবে না; তাদের কাজ করার মতো আধুনিক ল্যাব ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও থাকতে হবে। তাই টেকনাফ সরকারি কলেজের আইসিটি ল্যাবকে আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, টেকনাফের শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ছাড়া কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এ জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দসহ সবাইকে শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
টেকনাফ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) সন্তোষ শীলের সভাপতিত্বে কলেজের মতবিনিময় সভায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিনিধি/এলএ




